১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ও শহীদদের আত্মত্যাগ
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির শুরু থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) ওপর উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। অথচ মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি মানুষের মাতৃভাষা ছিল বাংলা।
এই অন্যায়ের প্রতিবাদে বাংলার ছাত্র, বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদার দাবিতে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি (বাংলা ৮ই ফাল্গুন, ১৩৫৮) তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করেন। মিছিলটি অগ্রসর হলে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে রফিক, শফিক, বরকত, জব্বার, সালামসহ আরও অনেকেই শহীদ হন। মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করার এমন নজির পৃথিবীতে আর কোথাও নেই।
ইউনেসকোর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও একুশে ফেব্রুয়ারির বিশ্বায়ন
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে দেশজুড়ে পালন করা হতে থাকে। পরবর্তীতে এই দিনটিকে বিশ্বমঞ্চে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
১. উদ্যোগ: কানাডা প্রবাসী দুই বাংলাদেশী—রফিকুল ইসলাম এবং আব্দুস সালাম—জাতিসংঘের কাছে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব করেন। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক আবেদনের মাধ্যমে এটি আন্তর্জাতিক মহলে গুরুত্ব পায়।
২. ঘোষণা: ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো (UNESCO) ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
৩. বিশ্বব্যাপী উদযাপন: ২০০০ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি থেকে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলো নিজ নিজ দেশে যথাযথ মর্যাদার সাথে এই দিবসটি পালন করে আসছে।
বিশ্বব্যাপী এই দিবসের গুরুত্ব ও মাতৃভাষা সংরক্ষণ
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশ্বমঞ্চে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে:
- ভাষাগত বৈচিত্র্য রক্ষা: পৃথিবীতে প্রায় ৭,০০০-এর বেশি ভাষা রয়েছে। এই দিবসটি প্রতিটি ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখা এবং বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করার তাগিদ দেয়।
- সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন: এটি বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্প্রীতি এবং বহুভাষী সংস্কৃতির প্রসার ঘটায়।
- মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি: নিজের মাতৃভাষায় কথা বলতে পারা মানুষের একটি জন্মগত ও মৌলিক অধিকার—২১শে ফেব্রুয়ারি বিশ্ববাসীকে প্রতিনিয়ত এই সত্যটি স্মরণ করিয়ে দেয়।
- একুশে ফেব্রুয়ারি কেবল বাংলাদেশের নয়, এটি আজ পৃথিবীর বুকে প্রতিটি মানুষের নিজের ভাষার অধিকার ও সংস্কৃতিকে উদযাপনের এক বৈশ্বিক প্রতীক।
২ টি মন্তব্য
লগইন করুন মন্তব্য করতে।