সঞ্চয়পত্রে টাকা রাখার পর শুধু মুনাফা পাওয়াই বিষয় নয়, আয়কর রিটার্নের সময় বিনিয়োগ ও মুনাফা থেকে কর্তিত করের হিসাবও ঠিকভাবে দেখাতে হয়। এ কারণে অনেক বিনিয়োগকারীকে প্রতিবছর সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগের তথ্য বা মুনাফা থেকে কেটে নেওয়া করের প্রমাণপত্র সংগ্রহ করতে হয়।
এই কাজের জন্য এখন জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের স্ব-সেবা ব্যবস্থা ব্যবহার করা যায়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, NSC Self Service System-এর মাধ্যমে বিনিয়োগ-সংক্রান্ত তথ্য, বিনিয়োগ প্রত্যয়নপত্র এবং কর কর্তনের সার্টিফিকেট দেখার সুবিধা রয়েছে।
কোন কোন তথ্য অনলাইনে পাওয়া যায়?
স্ব-সেবা ব্যবস্থায় প্রবেশ করার পর বিনিয়োগকারীর সঞ্চয়পত্র-সংক্রান্ত তথ্য দেখা যায়। প্রয়োজন অনুযায়ী এখান থেকে বিভিন্ন নথি সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে। যেমন—
- সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ-সংক্রান্ত তথ্য
- বিনিয়োগ প্রত্যয়নপত্র
- মুনাফা থেকে কর্তিত উৎসে করের সার্টিফিকেট
- বিনিয়োগের বিভিন্ন বিবরণ ও রিপোর্ট
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের অধীন একটি সরকারি অফিসের প্রকাশিত তথ্যে সরাসরি বলা হয়েছে, nsd.finance.gov/selfreport ঠিকানায় গিয়ে বিনিয়োগকারী বিনিয়োগ প্রত্যয়নপত্র, কর কর্তনের সার্টিফিকেট এবং বিনিয়োগ-সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য নিজেই জানতে পারবেন।
মোবাইল দিয়ে সঞ্চয়পত্রের প্রত্যয়নপত্র বের করার নিয়ম
স্মার্টফোন থেকেই কাজটি করার চেষ্টা করা যায়। তবে আপনার সঞ্চয়পত্রের তথ্য সিস্টেমে সঠিকভাবে সংরক্ষিত থাকা এবং পরিচয় যাচাইয়ের তথ্য মিলে যাওয়া প্রয়োজন।
১. সরকারি Self Service System-এ প্রবেশ করুন
প্রথমে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের স্ব-সেবা ব্যবস্থায় প্রবেশ করতে হবে। সরাসরি সরকারি সেবাটির ঠিকানা হলো:
অপরিচিত কোনো ওয়েবসাইটে NID, TIN, জন্মতারিখ বা OTP দেওয়ার পরিবর্তে সরকারি ঠিকানা থেকেই সেবাটি ব্যবহার করা নিরাপদ।
২. প্রয়োজনীয় পরিচয় তথ্য দিন
সিস্টেমে লগইন বা পরিচয় যাচাইয়ের সময় আপনার সঞ্চয়পত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত পরিচয় তথ্য চাওয়া হতে পারে। স্ক্রিনে যে তথ্য চাওয়া হবে, সেটিই সঠিকভাবে দিতে হবে।
তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—সঞ্চয়পত্রের রেকর্ডে থাকা তথ্যের সঙ্গে আপনার দেওয়া তথ্যের মিল না থাকলে লগইন বা যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন নাও হতে পারে।
৩. জন্মতারিখ ও মোবাইল নম্বর যাচাই করুন
পরিচয় যাচাইয়ের অংশ হিসেবে জন্মতারিখ ও মোবাইল নম্বরের মতো তথ্য প্রয়োজন হতে পারে। তাই সঞ্চয়পত্রের রেকর্ডে ব্যবহৃত তথ্য হাতে রেখে প্রক্রিয়াটি শুরু করলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কমে।
৪. OTP দিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করুন
পরিচয় যাচাইয়ের সময় মোবাইলে OTP পাঠানো হলে নির্ধারিত জায়গায় সেই কোডটি লিখতে হবে। OTP কারও সঙ্গে শেয়ার করবেন না। ব্যাংক, সঞ্চয় অফিস বা কোনো সরকারি সেবার নাম ব্যবহার করে কেউ ফোন করলেও OTP জানানো উচিত নয়।
৫. প্রয়োজনীয় সনদ বা তথ্য নির্বাচন করুন
পরিচয় যাচাই শেষ হলে আপনার সঞ্চয়পত্র-সংক্রান্ত তথ্য দেখার সুযোগ পাওয়া যাবে। প্রয়োজন অনুযায়ী বিনিয়োগের তথ্য, বিনিয়োগ প্রত্যয়নপত্র বা কর কর্তনের সার্টিফিকেটের অপশন খুঁজে নিতে হবে।
আরো পড়ুনঃ ৩০–৪০ বছর পুরোনো জমির বায়া দলিল খুঁজে বের করার নিয়ম
কোনো নির্দিষ্ট অর্থবছর বা করবর্ষের নথি প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট সময়ের তথ্য নির্বাচন করতে হবে। সিস্টেমে যে অপশন বা বছর দেখানো হবে, তার ভিত্তিতেই নথি সংগ্রহ করতে হবে।
সঞ্চয়পত্রের কর কর্তনের সার্টিফিকেট কেন প্রয়োজন?
সঞ্চয়পত্রের মুনাফা পাওয়ার সময় প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী উৎসে কর কাটা হতে পারে। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্যেও সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর উৎসে কর কর্তনের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।
এই কর আগে থেকেই কর্তন করা হয়েছে—এমন তথ্যের প্রমাণ হিসেবে কর কর্তনের সার্টিফিকেট প্রয়োজন হতে পারে। বিশেষ করে আয়কর রিটার্ন প্রস্তুতের সময় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংরক্ষণ করে রাখা সুবিধাজনক।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রিটার্ন-সংক্রান্ত নির্দেশিকাতেও সঞ্চয়পত্র থেকে সুদ বা মুনাফার আয় থাকলে সংশ্লিষ্ট সার্টিফিকেটের কপি রাখার কথা উল্লেখ রয়েছে।
বিনিয়োগ প্রত্যয়নপত্র কী কাজে লাগে?
বিনিয়োগ প্রত্যয়নপত্র মূলত সঞ্চয়পত্রে আপনার বিনিয়োগের তথ্যের একটি প্রমাণপত্র হিসেবে কাজে লাগতে পারে। আয়কর রিটার্ন প্রস্তুতের সময় নিজের আর্থিক সম্পদ ও বিনিয়োগের তথ্য সঠিকভাবে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে এই নথি সহায়ক হতে পারে।
তবে বিনিয়োগ প্রত্যয়নপত্র এবং কর কর্তনের সার্টিফিকেট এক জিনিস নয়। প্রথমটি বিনিয়োগের তথ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত, আর দ্বিতীয়টি মুনাফা থেকে কর্তিত করের তথ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রয়োজন অনুযায়ী দুটিই আলাদা করে সংরক্ষণ করা ভালো।
আয়কর রিটার্নের সময় কীভাবে কাজে লাগবে?
সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগকারীকে রিটার্ন তৈরির সময় নিজের বিনিয়োগ ও মুনাফার হিসাব মিলিয়ে দেখা দরকার। একই সঙ্গে মুনাফা থেকে আগে কোনো কর কেটে রাখা হয়ে থাকলে তার প্রমাণপত্রও সংরক্ষণ করা উচিত।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্দেশিকায় সঞ্চয়পত্রের সুদ বা মুনাফার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সার্টিফিকেটের কপি রাখার কথা উল্লেখ আছে। তাই বছরের শেষে নথিটি কোথায় রেখেছেন সেটি খুঁজে বের করার বদলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আগে থেকেই সংরক্ষণ করে রাখা সুবিধাজনক।
অনলাইনে তথ্য না দেখালে কী করবেন?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অনলাইনে তথ্য না পাওয়া মানেই আপনার সঞ্চয়পত্রের কোনো সমস্যা হয়েছে—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। তথ্য হালনাগাদ, পরিচয় যাচাই, মোবাইল নম্বরের অমিল কিংবা সিস্টেম-সংক্রান্ত কারণে সমস্যা হতে পারে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে কয়েকটি বিষয় যাচাই করতে পারেন:
- আপনি সঠিক পরিচয় তথ্য ব্যবহার করছেন কি না
- সঞ্চয়পত্রের রেকর্ডে থাকা মোবাইল নম্বরটি সঠিক কি না
- জন্মতারিখ ঠিকভাবে দেওয়া হয়েছে কি না
- সঠিক অর্থবছর বা করবর্ষ নির্বাচন করা হয়েছে কি না
- সিস্টেমে সাময়িক কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না
সবকিছু ঠিক থাকার পরও তথ্য না পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট সঞ্চয় অফিস বা যে প্রতিষ্ঠান থেকে সঞ্চয়পত্রটি ইস্যু করা হয়েছিল সেখানে যোগাযোগ করা উচিত। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরও তাদের ওয়েবসাইটে সঞ্চয়পত্র-সংক্রান্ত সেবা ও অফিসগুলোর তথ্য প্রকাশ করে।
OTP না এলে কী করবেন?
OTP না এলে বারবার ভুল কোড দেওয়ার চেষ্টা না করে প্রথমে মোবাইল নেটওয়ার্ক ও নম্বরটি ঠিক আছে কি না দেখুন। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে পুনরায় চেষ্টা করা যেতে পারে।
তারপরও সমস্যা থাকলে সঞ্চয়পত্রের রেকর্ডে আপনার মোবাইল নম্বরটি সঠিকভাবে যুক্ত আছে কি না যাচাই করা প্রয়োজন। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট অফিসের সহায়তা নিতে হবে।
আরো পড়ুনঃ নতুন বেতন স্কেল ২০২৬: ১ম থেকে ২০তম গ্রেডে কত টাকা বেতন হবে, সম্পূর্ণ তালিকা
NID ও OTP নিয়ে সতর্ক থাকুন
সঞ্চয়পত্রের তথ্য ব্যক্তিগত আর্থিক তথ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই অনলাইনে সেবা ব্যবহারের সময় নিরাপত্তার বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়।
- OTP কাউকে বলবেন না।
- অপরিচিত ব্যক্তিকে NID-এর তথ্য দেবেন না।
- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনবক্সে সঞ্চয়পত্রের নথি পাঠানোর আগে প্রয়োজনীয়তা যাচাই করুন।
- সরকারি সেবার ঠিকানা নিশ্চিত না হয়ে লগইন তথ্য দেবেন না।
- প্রত্যয়নপত্র ডাউনলোড করলে নিজের ফোন বা কম্পিউটারে নিরাপদ জায়গায় সংরক্ষণ করুন।
অফিসে না গিয়ে সব কাজ কি করা যাবে?
Self Service System-এর উদ্দেশ্যই হলো বিনিয়োগকারীদের সঞ্চয়পত্র-সংক্রান্ত কিছু তথ্য ও প্রত্যয়ন অনলাইনে দেখার সুযোগ দেওয়া। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নাগরিক ই-সেবা তালিকাতেও জাতীয় সঞ্চয় স্কিমসমূহের স্ব-সেবা ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে সঞ্চয়পত্র-সংক্রান্ত প্রতিটি সমস্যার সমাধান অনলাইনেই হবে। তথ্যের ভুল, পরিচয় যাচাইয়ের সমস্যা বা রেকর্ড সংশোধনের মতো বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অফিসের সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে।
প্রত্যয়নপত্র পাওয়ার পর কী করবেন?
প্রত্যয়নপত্র পাওয়া গেলে সেটি শুধু একবার দেখে রেখে না দিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী সংরক্ষণ করুন। বিশেষ করে আয়কর রিটার্নের সঙ্গে সম্পর্কিত নথি হলে পিডিএফ কপি নিজের কাছে রাখা ভালো। প্রয়োজনে কাগজে প্রিন্ট করেও রাখা যেতে পারে।
এতে পরবর্তী সময়ে সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ, মুনাফা এবং কর্তিত করের হিসাব মিলিয়ে দেখা সহজ হবে।
সরকারি সেবার লিংক
সঞ্চয়পত্রের Self Service System:
https://nsd.finance.gov/selfreport
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর:
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের সরকারি ওয়েবসাইট
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে কর্তিত উৎসে করের প্রত্যয়নপত্র বিতরণের তথ্যও প্রকাশ করা হয়েছে। তাই প্রয়োজনীয় নথি পাওয়ার ক্ষেত্রে অনলাইন সেবা এবং সংশ্লিষ্ট সঞ্চয় অফিস—দুই দিকের তথ্যই বিবেচনায় রাখা ভালো।