শৈশবে স্মৃতি: সোনালী অতীত
শৈশবের দুরন্তপনা, মায়ের স্নেহ, বাবার ভালোবাসা, বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো আনন্দময় মুহূর্ত এবং হারানো দিনের মধুর স্মৃতিতে ফিরে দেখুন এক সোনালী অতীতের আবেগঘন গল্প।
হারাইয়া যাওয়া দিনগুলির প্রতি এক নিবেদিত স্মৃতিগাথা
১. স্মৃতির দুয়ারে প্রত্যাবর্তন
মানবজীবনের পথ দীর্ঘ, অথচ তাহার প্রত্যেকটি বাঁক সমান নহে। কোনো বাঁকে অপেক্ষা করে আনন্দ, কোনো বাঁকে অশ্রু; কোনো পথে মিলন, কোনো পথে বিচ্ছেদ। সময়ের অদৃশ্য রথে চড়িয়া মানুষ চলিয়া যায় অজানার দিকে, পিছনে ফেলিয়া যায় পরিচিত মুখ, প্রিয় অঙ্গন, স্নেহময় কণ্ঠস্বর এবং জীবনের অসংখ্য অনির্বচনীয় মুহূর্ত। তবু আশ্চর্যের বিষয়, মানুষ যত দূরেই যাক, যত বড়ই হউক, তাহার অন্তরের গভীরতম প্রদেশে একটি ক্ষুদ্র পৃথিবী চিরকাল অক্ষত থাকিয়া যায়। সেই পৃথিবীর নাম শৈশব। সেখানে সময়ের হিসাব নাই, লাভক্ষতির অঙ্ক নাই, ভবিষ্যতের দুর্ভাবনা নাই; আছে কেবল নির্মল হাসি, অকারণ আনন্দ, অভিমান, কল্পনা এবং পৃথিবীকে প্রথমবার আবিষ্কার করিবার অপার বিস্ময়।
আজ বহু বৎসর পরে, জীবনের ব্যস্ত প্রহরগুলি যখন একটির পর একটি নিঃশব্দে অতিবাহিত হইয়া যায়, তখন সন্ধ্যার নিস্তব্ধতায় বসিয়া আমি প্রায়ই সেই হারাইয়া যাওয়া পৃথিবীর কথা ভাবি। জানালার বাহিরে নগরের আলো জ্বলে, যানবাহনের অবিরাম শব্দ বাতাসকে ভারাক্রান্ত করিয়া রাখে, মানুষের মুখে ক্লান্তির ছায়া দেখা যায়। চারিদিকে কত আয়োজন, কত প্রাচুর্য, কত অর্জন; তথাপি কোথায় যেন একটি গভীর শূন্যতা বুকের মধ্যে নীরবে বাসা বাঁধিয়া থাকে। মনে হয়, জীবনের সমস্ত প্রাপ্তির পরেও যেন এমন একটি অমূল্য সম্পদ রহিয়া গিয়াছে, যাহা আর কোনো দিন ফিরিয়া পাওয়া যাইবে না।
সেই সম্পদ আমার শৈশব। সেই শৈশবের নাম ছিল একটি ছোট্ট গ্রাম, গ্রামের নাম ছিল শালিখাপুর। মানচিত্রের বিশাল বিস্তারে তাহার স্থান হয়তো অতি সামান্য; কিন্তু আমার হৃদয়ের মানচিত্রে সেই গ্রামটি সমগ্র পৃথিবীর সমান। সেখানে ছিল আঁকাবাঁকা মেঠোপথ, বাঁশঝাড়ের ফাঁকে ফাঁকে নেমে আসা রৌদ্র, পুকুরের জলে ভাসমান শাপলা, বর্ষার কাদামাটি, শীতের সকালের কুয়াশা এবং গ্রীষ্মের দুপুরে আম্রবীথির ছায়া। সেইখানেই আমার প্রথম হাসি, প্রথম কান্না, প্রথম বন্ধুত্ব, প্রথম হারাইবার বেদনা এবং প্রথম বুঝিতে পারা যে, পৃথিবী কেবল আমাদের আনন্দের জন্যই নির্মিত নহে।
আমার জন্ম সেই গ্রামেই। পিতা ছিলেন গ্রামের বিদ্যালয়ের একজন সাধারণ শিক্ষক। তাঁহার আয় ছিল সীমিত, কিন্তু আত্মমর্যাদা ছিল পর্বতের ন্যায় অটল। মাতা সংসারের সমস্ত অভাবকে স্নেহের পর্দায় আচ্ছাদিত করিয়া রাখিতেন। আমাদের ছোট্ট গৃহখানি ছিল মাটির দেয়ালে গড়া, উপরে খড়ের ছাউনি। বর্ষাকালে কোথাও কোথাও ছাদ হইতে জল পড়িত; শীতকালে জানালার ফাঁক দিয়া শীতল বাতাস প্রবেশ করিত। তথাপি সেই গৃহে এমন এক উষ্ণতা ছিল, যাহা অট্টালিকার সহস্র প্রদীপেও সৃষ্টি করা সম্ভব নহে।
আজ বুঝিতে পারি, সুখের জন্য মানুষের যত আয়োজন, তাহার অধিকাংশই বাহ্যিক। যে গৃহে পরস্পরের প্রতি মমতা থাকে, সে গৃহ দারিদ্র্যের মধ্যেও স্বর্গ হইয়া উঠিতে পারে। আর যে গৃহে ভালোবাসার অভাব, সেখানে সোনার প্রাসাদও কখনো কখনো নিঃসঙ্গতার কারাগারে পরিণত হয়। আমার শৈশবের গৃহে অর্থের অভাব ছিল, কিন্তু ভালোবাসার অভাব ছিল না। সেই কারণেই আজও চোখ বন্ধ করিলে মাটির দেয়ালের গন্ধ পাই, মায়ের আঁচলের স্পর্শ অনুভব করি, পিতার গম্ভীর কণ্ঠস্বর শুনিতে পাই। মনে হয়, একটু হাত বাড়াইলেই সেই পুরাতন উঠান, সেই তুলসীতলা, সেই কুয়োর পাশের শিউলিগাছ আবার ছুঁইয়া দেখিতে পারিব।
কিন্তু স্মৃতির দুয়ার খুলিলেই মানুষ কেবল আনন্দের দেখা পায় না। সেখানে এমন কিছু দৃশ্যও অপেক্ষা করিয়া থাকে, যাহার দিকে চাহিলে হৃদয় কাঁপিয়া উঠে। কারণ, শৈশবের সোনালী আলো যত উজ্জ্বল, তাহার ছায়াও তত গভীর। সেই আলো ও ছায়ার মাঝখানেই লুকাইয়া রহিয়াছে আমার জীবনের প্রথম অধ্যায়।
২. আমাদের ছোট্ট গ্রাম
শালিখাপুর গ্রামটি ছিল নদীর কাছাকাছি। গ্রামের পশ্চিম প্রান্ত দিয়া একটি সরু নদী বহিয়া গিয়াছিল; বর্ষাকালে তাহার দুই কূল প্লাবিত হইত, আর শীতকালে নদীর বুকের অধিকাংশ জাগিয়া উঠিত বালুচরে। নদীর নাম ছিল মধুমতী। তাহার জল কখনো শান্ত, কখনো দুরন্ত। বর্ষার দিনে নদীকে দেখিলে মনে হইত, বহু দিনের জমিয়া থাকা অভিমান লইয়া সে বুঝি সমস্ত পৃথিবীকে ভাসাইয়া লইয়া যাইবে। আবার শীতের বিকালে তাহার বালুচরে দাঁড়াইলে মনে হইত, প্রকৃতি যেন ক্লান্ত শিশুর ন্যায় নিশ্চিন্তে ঘুমাইয়া পড়িয়াছে।
গ্রামের পূর্বদিকে ছিল একটি পুরাতন বটবৃক্ষ। তাহার ঝুলন্ত শিকড়গুলি মাটিতে নামিয়া আসিয়া নতুন কাণ্ডের জন্ম দিয়াছিল। বয়স্ক মানুষেরা বলিতেন, গাছটির বয়স নাকি এক শত বৎসরেরও অধিক। সেই বটতলায় বিকালবেলা গ্রামের প্রবীণেরা বসিয়া গল্প করিতেন। কেহ অতীত দিনের কথা বলিতেন, কেহ জমির হিসাব মিলাইতেন, কেহ আবার দেশের রাজনীতি লইয়া তর্ক করিতেন। আমরা শিশুরা সেই সমস্ত কথার অর্থ বুঝিতাম না, কিন্তু বয়স্কদের গুরুগম্ভীর মুখভঙ্গি দেখিয়া বিস্মিত হইতাম।
বটতলার পাশেই ছিল একটি কাঁচা রাস্তা। রাস্তার দুই ধারে ধানখেত, কলাগাছ, শিমুল ও কৃষ্ণচূড়া। বসন্তকালে শিমুলের লাল ফুল মাটিতে ঝরিয়া পড়িলে পথটি রক্তিম চাদরে আচ্ছাদিত হইত। বাতাসে ফুলের পাপড়ি উড়িয়া বেড়াইত, আর আমরা তাহা ধরিবার জন্য ছুটাছুটি করিতাম। কখনো পাপড়ি হাতে আসিত, কখনো বাতাসের সঙ্গে দূরে চলিয়া যাইত। সেই ব্যর্থ চেষ্টাতেও কী অপরিসীম আনন্দ ছিল! আজ জীবনের বহু মূল্যবান বস্তু অর্জন করিয়াও সেই সামান্য ফুল ধরিতে না পারিবার আনন্দের সমতুল্য সুখ আর কোথাও খুঁজিয়া পাই না।
আমাদের গ্রামের সকাল শুরু হইত পাখির ডাকে। সূর্য তখনও দিগন্তের আড়ালে, কিন্তু মোরগের ডাক, গোয়ালঘরের গরুর শব্দ, উঠানে ঝাড়ু দেওয়ার আওয়াজ এবং পুকুরঘাটে কলসির সঙ্গে জলের সংঘর্ষ মিলিয়া এক অদ্ভুত সুর সৃষ্টি করিত। দূরে কোনো গৃহবধূর কণ্ঠে ভেসে আসিত ভোরের গান। কুয়াশায় ঢাকা পথ দিয়া কৃষকেরা লাঙল কাঁধে মাঠের দিকে যাইতেন। তাঁহাদের পায়ের নিচে শিশিরভেজা ঘাস নত হইয়া পড়িত।
আমাদের বাড়ির পিছনে ছিল একটি বাঁশঝাড়। বাতাস প্রবাহিত হইলে বাঁশের পাতা পরস্পরের গায়ে ঘষিয়া মৃদু শব্দ তুলিত। রাত্রিবেলা সেই শব্দ শুনিয়া কখনো কখনো ভয় পাইতাম। মাতা তখন আমার মাথায় হাত বুলাইয়া বলিতেন, “ভয় পাইও না, ওগুলি গাছের কথা। বাতাসের সঙ্গে তাহাদেরও আলাপ হয়।” মায়ের এই কথাটি বহু বৎসর আমার মনে রহিয়া গিয়াছে। পরিণত বয়সে বুঝিয়াছি, প্রকৃতিকে ভালোবাসিবার জন্য শিশুর মনে যে কল্পনার প্রয়োজন, মাতা তাহারই প্রথম পাঠ দিয়াছিলেন।
গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না বলিলেই চলে। সন্ধ্যা নামিলে অধিকাংশ গৃহে কুপির আলো জ্বলিত। সেই আলোয় মানুষের মুখের উপর পড়িত হলুদ আভা; দেয়ালে নড়িয়া উঠিত ছায়া। রাতের আকাশে অসংখ্য তারা দেখা যাইত। শহরের ধোঁয়া ও আলোকদূষণে ঢাকা আকাশে আজ আর সেই তারাগুলি এমন উজ্জ্বল দেখিতে পাই না। তখন দাদির পাশে শুইয়া আকাশের দিকে চাহিয়া থাকিতাম এবং ভাবিতাম, প্রত্যেকটি তারা বুঝি একটি করিয়া অজানা দেশ, যেখানে আমাদের মতো শিশুরা বাস করে।
সেই গ্রামে আমাদের অভাব ছিল, কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের বিচ্ছেদ ছিল না। মাটির স্পর্শ, জলের শব্দ, পাখির উড়াল, ঋতুর পরিবর্তন—সবকিছুই ছিল আমাদের প্রতিদিনের জীবনের অংশ। আমরা জানিতাম না, পৃথিবীর অন্য প্রান্তে কেমন জীবন, বড় বড় নগরে কেমন আলো জ্বলে, মানুষ কীভাবে যন্ত্রের সাহায্যে দূরের মানুষের সঙ্গে কথা বলে। জানিবার প্রয়োজনও অনুভব করিতাম না। আমাদের ক্ষুদ্র পৃথিবীই ছিল সম্পূর্ণ।
এখন মনে হয়, মানুষ যখন বড় হইতে থাকে, তখন তাহার পৃথিবী আয়তনে বাড়ে, কিন্তু বিস্ময়ের ক্ষমতা ক্রমশ সংকুচিত হইয়া আসে। যে আকাশ একদিন অসীম রহস্যের আধার ছিল, আজ তাহা আবহাওয়ার পূর্বাভাসে সীমাবদ্ধ। যে নদী একদিন অভিযানের আহ্বান জানাইত, আজ তাহার কথা মনে পড়ে কেবল অবসর মুহূর্তে। তবু হৃদয়ের গোপন কুঠুরিতে শালিখাপুরের আকাশ, নদী ও বটবৃক্ষ আজও আগের মতোই জীবন্ত।
৩. মায়ের আঁচল ও পিতার ছায়া
শৈশবের স্মৃতিতে মায়ের মুখটি সর্বাগ্রে ভাসিয়া উঠে। তিনি ছিলেন অতি সাধারণ এক গ্রাম্য নারী। তাঁহার সাজসজ্জায় আড়ম্বর ছিল না, কথাবার্তায় কৃত্রিমতা ছিল না, নিজের সুখের জন্য বিশেষ কোনো আকাঙ্ক্ষাও ছিল না। ভোর হইতে রাত্রি পর্যন্ত সংসারের কাজেই তাঁহার দিন কাটিত। কখনো চুলায় আগুন জ্বালিতেন, কখনো ধান ভানিতেন, কখনো পুকুরঘাট হইতে জল আনিতেন, কখনো আবার ছেঁড়া জামা সেলাই করিতেন। এত কাজের পরেও আমার মুখের দিকে চাহিয়া হাসিবার শক্তি তাঁহার কোথা হইতে আসিত, তাহা আজও বুঝিতে পারি না।
আমি ছোটবেলায় প্রায়ই অসুস্থ হইতাম। সামান্য জ্বর হইলেও মায়ের মুখে উদ্বেগের ছায়া পড়িত। রাত্রিবেলা আমার কপালে হাত রাখিয়া তিনি বসিয়া থাকিতেন। কখনো ভেজা কাপড় দিয়া কপাল মুছাইতেন, কখনো ঔষধ খাওয়াইতেন, কখনো আবার নীরবে প্রার্থনা করিতেন। আমি আধোঘুমে তাঁহার মুখের দিকে চাহিয়া দেখিতাম। প্রদীপের ক্ষীণ আলোয় সেই মুখটি আমার কাছে পৃথিবীর সমস্ত নিরাপত্তার প্রতীক বলিয়া মনে হইত।
একবার বর্ষাকালে আমার ভীষণ জ্বর হইল। টানা তিন দিন আমি বিছানা হইতে উঠিতে পারিলাম না। পিতা তখন বিদ্যালয়ের কাজে দূরের গ্রামে গিয়াছিলেন। মাতা একাকী আমার সেবা করিতেছিলেন। রাত গভীর হইলে ঝড় উঠিল, বৃষ্টির জলে উঠান ভাসিয়া গেল। ঘরের এক কোণে ছাদ চুইয়া জল পড়িতেছিল। মাতা একটি পাত্র সেই স্থানে রাখিয়া আবার আমার পাশে আসিয়া বসিলেন। আমি তাঁহার হাত ধরিয়া বলিয়াছিলাম, “মা, তুমি ঘুমাইবে না?” তিনি মৃদু হাসিয়া বলিয়াছিলেন, “তুমি সুস্থ হইয়া উঠিলে আমি অনেক ঘুমাইব।”
সেই উত্তর শুনিয়া শিশুমনে এক অদ্ভুত শান্তি নামিয়া আসিয়াছিল। তখন বুঝি নাই, মায়ের নিজেরও শরীর আছে, ক্লান্তি আছে, ঘুমের প্রয়োজন আছে। শিশুর কাছে মাতা যেন এমন এক সত্তা, যাঁহার কখনো অবসাদ আসে না, যিনি কখনো কাঁদেন না, যাঁহার সমস্ত পৃথিবী কেবল সন্তানকে ঘিরিয়াই আবর্তিত হয়। বড় হইয়া বুঝিয়াছি, মায়ের সেই নিরন্তর সেবা কোনো অলৌকিক শক্তি নহে; তাহা ভালোবাসার এমন এক রূপ, যাহার সামনে পৃথিবীর সমস্ত স্বার্থপরতা ক্ষুদ্র হইয়া যায়।
পিতার স্নেহ ছিল অন্যরূপ। তিনি অল্প কথা বলিতেন। মুখে কঠোরতা থাকিলেও অন্তরে ছিলেন কোমল। বিদ্যালয় হইতে ফিরিয়া তিনি প্রথমে আমার পড়াশোনার খোঁজ লইতেন, পরে উঠানে বসিয়া জুতা খুলিয়া পায়ের ধুলা ঝাড়িতেন। তাঁহার পরিধানে থাকিত ধুতি, সাদা পাঞ্জাবি এবং কাঁধে একটি পুরাতন গামছা। বর্ষার দিনে ছাতাটি প্রায়ই উল্টাইয়া যাইত, তবু তিনি প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যাইতেন।
পিতার একটি পুরাতন কাঠের বাক্স ছিল। সেই বাক্সে কিছু বই, কয়েকটি চিঠি, একটি ভাঙা ঘড়ি এবং কাপড়ে মোড়ানো কিছু কাগজ রাখা থাকিত। একদিন কৌতূহলবশত বাক্সটি খুলিয়া দেখিয়াছিলাম। পিতা আমাকে দেখিয়া রাগ করিলেন না। বরং পাশে বসাইয়া বলিলেন, “মানুষের জীবনে ধনসম্পদের চেয়ে জ্ঞান অধিক স্থায়ী। টাকা হারাইলে আবার উপার্জন করা যায়, কিন্তু জ্ঞান অর্জনের সুযোগ হারাইলে সেই ক্ষতি পূরণ করা কঠিন।”
তখন কথাগুলির গভীরতা বুঝি নাই। আমার মনে হইত, বিদ্যালয়ের বইয়ের চেয়ে নদীর মাছ ধরা, গাছে চড়া কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে খেলা অনেক বেশি আনন্দের। পিতার উপদেশ শুনিয়া মাথা নাড়িতাম, কিন্তু সুযোগ পাইলে বই বন্ধ করিয়া ছুটিয়া যাইতাম মাঠে। তিনি জানিতেন। কখনো বকিতেন, কখনো কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলিতেন। সেই দীর্ঘশ্বাসের অর্থ বহু বৎসর পরে বুঝিতে শিখিয়াছি।
আমাদের সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। ঈদের আগে নতুন জামা কেনার সামর্থ্য সব বৎসর থাকিত না। পূজার মেলায় আমার জন্য খেলনা কিনিবার সময় পিতাকে বহুবার হিসাব করিতে দেখিয়াছি। নিজের প্রয়োজন তিনি নীরবে ত্যাগ করিতেন। তাঁহার পুরাতন জুতার তলা ক্ষয় হইয়া গেলেও নতুন জুতা কিনিতেন না; অথচ আমার বিদ্যালয়ের বেতন জমিয়া গেলে নির্দিষ্ট দিনে তাহা পরিশোধ করিবার জন্য অতিরিক্ত কাজ করিতেন।
এক শীতের সকালে দেখি, পিতার গায়ে পাতলা চাদর, অথচ আমার গায়ে নতুন উলের জামা। আমি প্রশ্ন করিয়াছিলাম, “তোমার জন্য নতুন চাদর কেনা হইল না কেন?” তিনি হাসিয়া বলিয়াছিলেন, “আমার ঠান্ডা কম লাগে।” আমি সরল বিশ্বাসে কথাটি মানিয়া লইয়াছিলাম। আজ জানি, সেই কথার আড়ালে লুকাইয়া ছিল একজন পিতার নিঃশব্দ আত্মত্যাগ।
মাতা আমাকে ভালোবাসিতে শিখাইয়াছিলেন, আর পিতা শিখাইয়াছিলেন দায়িত্বের অর্থ। একজনের আঁচলে ছিল আশ্রয়, অন্যজনের ছায়ায় ছিল পথ চলিবার সাহস। শৈশবে এই দুই ভালোবাসাকে স্বাভাবিক বলিয়া গ্রহণ করিয়াছিলাম। ভাবিতাম, পৃথিবীর প্রত্যেকটি শিশুই বুঝি এমন দুইটি নিরাপদ হাতের মধ্যে বড় হইয়া উঠে। পরিণত বয়সে দেখিয়াছি, সকলের ভাগ্যে এই সৌভাগ্য জোটে না। তখন নিজের শৈশবের প্রতি কৃতজ্ঞতায় হৃদয় ভরিয়া উঠে।
৪. বিদ্যালয়ের পথে
আমার বিদ্যালয়ের নাম ছিল শালিখাপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়। গ্রামের উত্তর প্রান্তে একটি পুরাতন দোতলা ভবন, সামনে প্রশস্ত মাঠ এবং মাঠের এক কোণে একটি নিমগাছ। ভবনের দেয়ালে চুনকাম অনেক দিন করা হয় নাই। বর্ষার বৃষ্টিতে দেয়ালের কিছু অংশে শ্যাওলা জন্মিয়াছিল। জানালার কাঠে বয়সের চিহ্ন, বেঞ্চগুলির গায়ে অগণিত শিশুর নাম ও আঁকিবুঁকি। কিন্তু আমাদের কাছে সেই বিদ্যালয় ছিল জ্ঞানের এক বিস্ময়কর রাজ্য।
প্রতিদিন সকালে বইখাতা একটি কাপড়ের ব্যাগে ভরিয়া বিদ্যালয়ের উদ্দেশে রওনা হইতাম। পথের অধিকাংশই ছিল মেঠোপথ। বর্ষাকালে কাদায় পা ডুবিয়া যাইত, শীতে শিশিরে জুতা ভিজিয়া উঠিত, গ্রীষ্মে ধুলা উড়িয়া জামাকাপড় মলিন হইত। তবু সেই পথ কখনো বিরক্তিকর মনে হইত না। কারণ, পথে ছিল বন্ধুদের সঙ্গে দেখা, খেলার পরিকল্পনা, গাছের ফল কুড়ানো এবং বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর পূর্বেই কয়েকটি ছোটখাটো দুষ্টুমি করিবার সুযোগ।
আমাদের শ্রেণিশিক্ষক ছিলেন হরিপদবাবু। বয়সে প্রবীণ, মুখে সাদা গোঁফ, চোখে মোটা কাচের চশমা। তাঁহার কণ্ঠস্বর ছিল দৃঢ়, কিন্তু ছাত্রদের প্রতি স্নেহ ছিল গভীর। ভুল উত্তর দিলে তিনি বকিতেন, তবে সেই বকুনির পরেই বুঝাইয়া দিতেন কোথায় ভুল হইয়াছে। কোনো ছাত্রের বাড়িতে অভাব থাকিলে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী বই কিংবা খাতা কিনিয়া দিতেন। আমরা তখন তাঁহাকে ভয় করিতাম; আজ তাঁহার মতো একজন শিক্ষক পাওয়া কত বড় সৌভাগ্য, তাহা বুঝিতে পারি।
বাংলা পড়াইবার সময় তিনি কবিতা আবৃত্তি করিতেন। তাঁহার কণ্ঠে নদী, আকাশ, মেঘ ও মানুষের কথা যেন নতুন জীবন লাভ করিত। একদিন তিনি বলিলেন, “শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাইবার জন্য পড়িও না। বই পড়িলে মানুষের মন বড় হয়। যে মানুষ অন্যের দুঃখ বুঝিতে শেখে, প্রকৃত শিক্ষিত সে-ই।” কথাটি শ্রেণিকক্ষের বাতাসে ভাসিয়া রহিল। তখন হয়তো আমরা কয়েকজন জানালার বাহিরে উড়ন্ত পাখি দেখিতেছিলাম; কিন্তু সেই বাক্য আমার মনে অদৃশ্যভাবে স্থান করিয়া লইয়াছিল।
বিদ্যালয়ের টিফিনের সময় ছিল আমাদের দিনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায়। কাহারো ডিবায় মুড়ি, কাহারো গুড়, কাহারো হাতে মায়ের বানানো রুটি। যাহার কাছে কিছু থাকিত না, সে-ও বন্ধুদের পাশে বসিয়া ভাগ পাইত। খাবারের পর মাঠে দৌড়াদৌড়ি, কাবাডি, গোল্লাছুট এবং লুকোচুরি চলিত। কখনো বল মাঠের বাহিরে চলিয়া গেলে সকলে একযোগে ছুটিতাম। বিজয়ী ও পরাজিতের মধ্যে কোনো স্থায়ী বিরোধ ছিল না। খেলার পর আবার সবাই একসঙ্গে বসিয়া গল্প করিতাম।
একদিন গণিতের পরীক্ষায় আমি অঙ্কের একটি বড় প্রশ্ন ভুল করিলাম। বাড়ি ফিরিবার পথে আমার মন ভারাক্রান্ত ছিল। পিতা জানিলে নিশ্চয়ই দুঃখ পাইবেন, এই চিন্তায় চোখে জল আসিতেছিল। বন্ধু নীলয় আমার অবস্থা বুঝিতে পারিয়া বলিল, “একটি অঙ্ক ভুল হইলে মানুষ ভুল হইয়া যায় না। আবার শিখিয়া লইবি।” তাহার কথায় আমি হাসিয়া ফেলিয়াছিলাম। আজ মনে হয়, সেই সামান্য বাক্যটি ছিল জীবনের এক গভীর শিক্ষা।
বিদ্যালয়ের বার্ষিক অনুষ্ঠানের দিনগুলি ছিল আরও আনন্দময়। আমরা কবিতা আবৃত্তি করিতাম, গান গাহিতাম, নাটকে অভিনয় করিতাম। আমার কণ্ঠস্বর ভালো ছিল না, কিন্তু একবার একটি ছোট নাটকে কৃষকের পুত্রের ভূমিকায় অভিনয় করিয়াছিলাম। পিতা সামনের সারিতে বসিয়া ছিলেন। নাটক শেষ হইলে তিনি হাততালি দিয়াছিলেন। সেই হাততালির শব্দ আমার কানে এমনভাবে বাজিয়াছিল যে, বহু দিন পর্যন্ত আমি নিজেকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বলিয়া ভাবিয়াছিলাম।
আজ যখন শিক্ষার প্রতিযোগিতা, পরীক্ষার চাপ এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তায় শিশুদের শৈশব সংকুচিত হইতে দেখি, তখন সেই বিদ্যালয়ের কথা মনে পড়ে। আমাদেরও পরীক্ষা ছিল, পড়ার চাপ ছিল, কিন্তু খেলার জন্য সময় ছিল, ভুল করিবার অবকাশ ছিল, শিক্ষককে প্রশ্ন করিবার সাহস ছিল। আমরা কেবল ফলাফল ছিলাম না; আমরা ছিলাম কৌতূহলী, অপরিণত, আনন্দময় কিছু শিশু। আমাদের বড় হইবার পথে পৃথিবী তখনও এত তাড়াহুড়া করিত না।
৫. নীলয়, আমার শৈশবের বন্ধু
শৈশবের কথা বলিতে গেলে নীলয়ের কথা না বলিয়া উপায় নাই। সে ছিল আমার প্রতিবেশী, সহপাঠী এবং সমস্ত দুষ্টুমির প্রধান সঙ্গী। আমাদের বাড়ির মাঝখানে ছিল একটি সরু বাঁশের বেড়া। বেড়ার ফাঁক দিয়া একে অন্যের উঠানে যাতায়াত করিতাম। কখনো আমার মা তাহাকে ডাকিয়া খাওয়াইতেন, কখনো তাহার মা আমার হাতে মুড়ি ও নারকেল দিয়া পাঠাইতেন। আমাদের দুই পরিবারের মধ্যে এমন ঘনিষ্ঠতা ছিল যে, কে কাহার বাড়ির শিশু, তাহা অনেক সময় পৃথক করিয়া বোঝা কঠিন হইত।
নীলয়ের চোখে সর্বদা কৌতূহলের ঝিলিক থাকিত। কোনো গাছে ফল দেখিলে সে জানিতে চাইত, ফলটি পাকা কি না; কোনো পাখি ডাকিলে সে তাহার নাম জানিবার চেষ্টা করিত; নদীর বালুচরে অদ্ভুত আকৃতির পাথর দেখিলে সে তাহাকে গুপ্তধনের অংশ বলিয়া ঘোষণা করিত। আমি তাহার কল্পনার জগতে সহজেই প্রবেশ করিতাম। আমরা কখনো নিজেদের নৌকার মাঝি ভাবিতাম, কখনো দূর দেশের অভিযাত্রী, কখনো আবার গ্রামের রক্ষক, যাহাদের দায়িত্ব ছিল সকল বিপদ হইতে মানুষকে রক্ষা করা।
গ্রীষ্মের এক দুপুরে আমরা সিদ্ধান্ত করিলাম, গ্রামের পশ্চিমের আমবাগানে অভিযান চালাইব। বাগানের মালিক ছিলেন কঠোর স্বভাবের এক বৃদ্ধ। তাঁহার অনুমতি ব্যতীত আম পাড়া নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু কাঁচা আমের প্রতি আমাদের আকর্ষণ এত প্রবল হইল যে, সমস্ত সতর্কতা উপেক্ষা করিয়া বাগানের দিকে রওনা হইলাম। নীলয় একটি লম্বা বাঁশ সংগ্রহ করিল, আর আমি একটি পুরাতন ঝুড়ি লইলাম।
আমরা যখন গাছের নিচে পৌঁছাইলাম, তখন বাতাসে পাকা আমের মিষ্টি গন্ধ। নীলয় বাঁশ তুলিয়া একটি আমের দিকে তাক করিল। প্রথম আঘাতে আম পড়িল না, দ্বিতীয় আঘাতে একটি ডাল হইতে শুকনো পাতা ঝরিয়া পড়িল। তৃতীয়বার আঘাত করিবার পূর্বেই পিছন হইতে বৃদ্ধের গলা শোনা গেল। আমরা এমনভাবে দৌড় দিলাম যে, ঝুড়ি, বাঁশ এবং আমার একটি স্যান্ডেল বাগানেই পড়িয়া রহিল।
সন্ধ্যায় বৃদ্ধ আমাদের বাড়িতে আসিলেন। আমি ভয়ে মাটির দিকে চাহিয়া দাঁড়াইয়া রহিলাম। পিতা সমস্ত কথা শুনিলেন এবং আমাকে কিছুক্ষণ নীরবে দেখিলেন। পরে তিনি বৃদ্ধের নিকট ক্ষমা চাহিয়া বলিলেন, “ছেলেরা ভুল করিয়াছে। আপনি যাহা শাস্তি উপযুক্ত মনে করেন, বলুন।” বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া শেষে হাসিয়া ফেলিলেন। তিনি বলিলেন, “শাস্তি আর কী দিব? কাল সকালে দুইজনকে লইয়া আসিবেন। গাছের গোড়ায় আগাছা পরিষ্কার করিবে, তাহার পর আম খাইবে।”
পরদিন আমরা সত্যিই বাগানে গেলাম। কাজ করিয়া বৃদ্ধের কাছ হইতে অনুমতি লইয়া আম খাইলাম। সেই আমের স্বাদ আজও স্মরণে আছে। কিন্তু স্বাদের চেয়েও অধিক মনে আছে, ভুল করিবার পর ক্ষমা চাহিবার শিক্ষা। নীলয় বলিয়াছিল, “দেখিলি, সত্য বলিলে সব সময় মার খাইতে হয় না।” আমি তাহাকে বলিয়াছিলাম, “কিন্তু সত্য বলিবার আগে বুক কাঁপে।” আমরা দুজনেই হাসিয়াছিলাম।
বর্ষাকালে নদীতে জল বাড়িলে আমরা নৌকা দেখিতে যাইতাম। একদিন নীলয় একটি ছোট কাগজের নৌকা বানাইয়া জলে ভাসাইল। আমি তাহার পাশে আরেকটি নৌকা ছাড়িলাম। নৌকা দুইটি পাশাপাশি চলিতে লাগিল। কিছু দূর যাইবার পর একটি নৌকা ঘূর্ণির মধ্যে পড়িয়া ডুবিয়া গেল, অন্যটি স্রোতের সঙ্গে দূরে চলিয়া গেল। নীলয় দীর্ঘক্ষণ ডুবে যাওয়া নৌকার দিকে চাহিয়া থাকিয়া বলিল, “যাহারা একসঙ্গে যাত্রা শুরু করে, তাহারা কি সব সময় একসঙ্গে গন্তব্যে পৌঁছায়?”
প্রশ্নটি শুনিয়া আমি অবাক হইয়াছিলাম। শিশুমনে এমন প্রশ্নের উত্তর কোথায়! আমি বলিয়াছিলাম, “আমরা তো একসঙ্গেই থাকিব।” নীলয় হাসিয়াছিল। আমরা জানিতাম না, জীবনের স্রোত কাগজের নৌকার মতোই মানুষকে কখনো পাশাপাশি, কখনো দূরে লইয়া যায়। কিছু বিচ্ছেদ আসে অজান্তে, কিছু আসে প্রয়োজনের কারণে, আর কিছু বিচ্ছেদ এমন চিরস্থায়ী যে, তাহার পরে আর কোনো মিলনের দিন থাকে না।
আমাদের বন্ধুত্বে কোনো প্রতিযোগিতা ছিল না। আমার কাছে নতুন পেন্সিল থাকিলে নীলয় তাহা ব্যবহার করিত, তাহার কাছে নতুন বই থাকিলে আমি পড়িতাম। কখনো ঝগড়া হইত, কখনো রাগ করিয়া কথা বন্ধ থাকিত, কিন্তু পরদিন বিদ্যালয়ের পথে দেখা হইলেই সমস্ত অভিমান মিলাইয়া যাইত। বন্ধুত্বের জন্য আমাদের কোনো শপথের প্রয়োজন ছিল না। আমরা জানিতাম না, বন্ধুত্ব কীভাবে রক্ষা করিতে হয়; আমরা কেবল বন্ধুর পাশে থাকিতে জানিতাম।
আজ বহু পরিচিত মানুষের ভিড়ে নীলয়ের মতো একজন মানুষকে খুঁজিয়া ফিরি। যাহার কাছে নিজের দুর্বলতা লুকাইতে হয় না, ব্যর্থতার ব্যাখ্যা দিতে হয় না, আনন্দের সংবাদ জানাইবার পূর্বে লাভক্ষতির হিসাব করিতে হয় না—এমন মানুষ জীবনে বিরল। শৈশবের বন্ধুত্বের মূল্য হয়তো এইখানেই যে, তাহা মানুষকে গ্রহণ করিতে শেখায়, পরিবর্তন করিতে নয়।
৬. বর্ষার দিন ও কাগজের নৌকা
আমাদের গ্রামের বর্ষা ছিল এক স্বতন্ত্র মহাকাব্য। আষাঢ় মাসের প্রথম বৃষ্টি নামিলে মাটির গন্ধে সমস্ত গ্রাম ভরিয়া উঠিত। শুকনো পুকুরের তলদেশ জলমগ্ন হইত, খালের দুই কূল উপচাইয়া পড়িত, ধানখেতের সবুজ রং আরও গাঢ় হইয়া উঠিত। আকাশে কালো মেঘ জমিলে আমরা জানালার পাশে দাঁড়াইয়া থাকিতাম। প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা উঠানের ধুলা ভিজাইয়া দিলে মনে হইত, পৃথিবী দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলিয়াছে।
বৃষ্টির দিনে বিদ্যালয়ে যাওয়া ছিল এক দুঃসাহসিক অভিযান। মাথায় ছাতা, হাতে বইয়ের ব্যাগ, পায়ে কাদা—এই সাজে আমরা পথ চলিতাম। কোথাও হাঁটুসমান জল, কোথাও পিচ্ছিল মাটি। অনেক সময় বিদ্যালয়ে পৌঁছাইবার পূর্বেই আমাদের জামাকাপড় ভিজিয়া যাইত। হরিপদবাবু ভেজা ছাত্রদের দেখিয়া বিরক্ত হইতেন না; বরং জানালার পাশে দাঁড় করাইয়া শুকাইতে দিতেন। সেই দিনগুলিতে বইয়ের পাতায় বৃষ্টির ফোঁটা পড়িয়া কালির দাগ ছড়াইয়া যাইত, আর আমরা সেই দাগের মধ্যে অদ্ভুত সব মানচিত্র আবিষ্কার করিতাম।
একবার প্রবল বর্ষণে আমাদের বাড়ির সামনের পথটি ছোট নদীতে পরিণত হইল। ঘরের চাল হইতে অবিরাম জল পড়িতেছিল। মাতা রান্নাঘরে খিচুড়ি বসাইয়াছিলেন। বাইরে বৃষ্টির শব্দ, ভিতরে চুলার আগুন, আর হাঁড়ি হইতে ভেসে আসা চাল-ডালের গন্ধ—সেই পরিবেশে পৃথিবীর সমস্ত দুঃখ যেন দূরে সরিয়া গিয়াছিল। পিতা বিদ্যালয় হইতে ফিরিয়া ভেজা কাপড় পরিবর্তন করিলেন। আমরা সবাই মাটির মেঝেতে বসিয়া গরম খিচুড়ি খাইলাম। সঙ্গে ছিল ডিমভাজি ও কাঁচা মরিচ।
খাওয়ার পর নীলয় আসিল। আমরা পুরাতন খাতার পাতা ছিঁড়িয়া নৌকা বানাইলাম। মাতা প্রথমে নিষেধ করিলেন, কারণ খাতাটি আমার পড়াশোনার জন্য প্রয়োজন ছিল। কিন্তু পিতা বলিলেন, “আজ বৃষ্টি, আজ ওদের নৌকা ভাসাইতে দাও। আগামীকাল নতুন পাতা জোগাড় করা যাইবে।” মায়ের মুখে মৃদু হাসি ফুটিয়া উঠিল। আমরা উঠানের জলে একের পর এক নৌকা ছাড়িতে লাগিলাম।
একটি নৌকার গায়ে আমি নিজের নাম লিখিলাম, আরেকটির গায়ে নীলয়ের। আমাদের বিশ্বাস ছিল, যাহার নৌকা অধিক দূর যাইবে, সে জীবনে অধিক বড় হইবে। আমার নৌকাটি উঠানের এক কোণে জমিয়া থাকা জলে আটকা পড়িল। নীলয়ের নৌকা বৃষ্টির স্রোতে ভাসিয়া বাঁশঝাড়ের দিকে চলিয়া গেল। সে আনন্দে চিৎকার করিয়া উঠিল। আমি প্রথমে মন খারাপ করিলেও পরে তাহার আনন্দে নিজেও হাসিতে লাগিলাম।
সেই ক্ষুদ্র নৌকার খেলায় আমরা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কত স্বপ্ন দেখিয়াছিলাম! নীলয় বলিয়াছিল, সে একদিন বড় নৌকা কিনিবে। আমি বলিয়াছিলাম, দূর দেশের বই পড়িব এবং বহু দেশ দেখিব। আমরা কল্পনা করিতাম, নদীর ওপারে হয়তো এমন কোনো রাজ্য আছে, যেখানে আকাশের রং অন্যরকম, মানুষের ঘরগুলি সোনায় মোড়ানো এবং প্রত্যেক শিশুর হাতে একটি করিয়া বই। আমাদের স্বপ্নের কোনো সীমানা ছিল না।
আজ ভাবিলে বিস্মিত হই, কাগজের সেই নৌকাগুলি আমাদের কত বড় শিক্ষা দিয়াছিল। কোনো নৌকা অল্প দূরেই ডুবিয়া যাইত, কোনোটি স্রোতে ভাসিয়া অদৃশ্য হইত, কোনোটি আবার ঘাসে আটকা পড়িত। তবু আমরা নৌকা বানানো বন্ধ করি নাই। একটির ব্যর্থতার পর আরেকটি নৌকা তৈরি করিয়াছি। জীবনের পথেও কি তাহাই প্রয়োজন নহে? ব্যর্থতার পর নতুন আশা, বিচ্ছেদের পর নতুন সম্পর্ক, অন্ধকারের পর নতুন আলোর অপেক্ষা?
কিন্তু জীবনের নৌকা কাগজের নৌকার মতো নহে। এখানে সব সময় নতুন পাতা পাওয়া যায় না, সব হারানো মানুষ ফিরিয়া আসে না। কখনো কোনো স্বপ্নের মৃত্যু ঘটে, কখনো কোনো সম্পর্কের স্রোত শুকাইয়া যায়। তবু শৈশবের সেই নৌকাগুলি মনে করাইয়া দেয়—মানুষের হৃদয়ে আশা যত দিন জীবিত, তত দিন সে সম্পূর্ণ পরাজিত নহে।
৭. উৎসবের আলো ও ভাগ করিয়া নেওয়া আনন্দ
আমাদের গ্রামে উৎসব আসিত ঋতুর পরিবর্তনের মতোই স্বাভাবিক অথচ আনন্দময় ছন্দে। ঈদের আগে গ্রামের বাজারে ভিড় বাড়িত, দোকানগুলিতে নতুন কাপড় ঝুলিত, মিষ্টির দোকান হইতে ভেসে আসিত চিনির রস ও ভাজার গন্ধ। শিশুদের চোখে থাকিত নতুন পোশাকের স্বপ্ন। যাহাদের সামর্থ্য বেশি, তাহারা নানারঙের জামা কিনিত; যাহাদের সামর্থ্য কম, তাহারা পুরাতন পোশাক পরিষ্কার করিয়া নতুনের মতো পরিবার চেষ্টা করিত। তবু উৎসবের আনন্দ কেবল পোশাকের উপর নির্ভর করিত না।
আমাদের বাড়িতে ঈদের প্রস্তুতি শুরু হইত কয়েক দিন আগে। মাতা ঘর পরিষ্কার করিতেন, চাল-ডাল গুছাইয়া রাখিতেন, সেমাই ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করিতেন। পিতা বাজার হইতে ফিরিয়া ব্যাগ নামাইলে আমি প্রথমে খুঁজিতাম, আমার জন্য কী আনা হইয়াছে। কখনো নতুন জামা, কখনো জুতা, কখনো সামান্য মিষ্টি। উপহার ছোট হইলেও আমার আনন্দের সীমা থাকিত না। আমি জামাটি বারবার পরিয়া দেখিতাম, আয়নার সামনে দাঁড়াইতাম এবং নীলয়কে দেখাইবার জন্য অপেক্ষা করিতাম।
এক বৎসর পিতার আয় কম হইবার কারণে আমার জন্য নতুন জামা কেনা সম্ভব হইল না। তিনি আমাকে বুঝাইবার চেষ্টা করিলেন, কিন্তু শিশুমনের অভিমান সহজে দূর হয় না। আমি মুখ ভার করিয়া বসিয়া রহিলাম। মাতা আমার পুরাতন জামাটি ধুইয়া, ইস্ত্রি করিয়া, একটি ছোট ছেঁড়া অংশ সেলাই করিয়া এমনভাবে সাজাইলেন যে, দূর হইতে তাহা নতুন বলিয়াই মনে হইত। তিনি জামাটি আমার হাতে দিয়া বলিলেন, “সুখের পোশাক কাপড়ে নহে, মনে।”
তখন কথাটি আমার পছন্দ হয় নাই। আমি মনে মনে ভাবিয়াছিলাম, নতুন জামা না পাইবার দুঃখ মাতা বুঝিতে পারিতেছেন না। কিন্তু ঈদের দিন নীলয়ের বাড়িতে গিয়া দেখি, তাহারও নতুন জামা কেনা হয় নাই। সে পুরাতন জামা পরিয়াই হাসিমুখে দাঁড়াইয়া আছে। আমরা একসঙ্গে নামাজের মাঠে গেলাম, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করিলাম, মিষ্টি খাইলাম। দিনের শেষে বুঝিলাম, জামার অভাব থাকিলেও আনন্দের অভাব হয় নাই।
ঈদের পরে গ্রামে মেলা বসিত। মাঠের এক পাশে নাগরদোলা, অন্য পাশে মাটির খেলনা, বাঁশি, কাঠের ঘোড়া, রঙিন বেলুন এবং নানা রকম মিষ্টির দোকান। আমরা পিতার হাত ধরিয়া মেলায় যাইতাম। আমার কাছে সামান্য কিছু টাকা থাকিত। সেই টাকায় সবকিছু কেনা সম্ভব ছিল না; তাই দীর্ঘক্ষণ দোকানগুলির সামনে দাঁড়াইয়া দেখিতাম। কখনো একটি কাঠের বাঁশি কিনিতাম, কখনো মাটির পাখি। বাড়ি ফিরিবার পথে বাঁশি বাজাইতে বাজাইতে মনে হইত, সমস্ত গ্রামের মানুষ বুঝি আমার আনন্দের সংবাদ শুনিতেছে।
মেলায় একবার একটি দরিদ্র বালককে দেখিয়াছিলাম। সে একটি কাঠের ঘোড়ার দিকে স্থির চোখে চাহিয়া ছিল। তাহার পরনে মলিন জামা, পায়ে জুতা নাই। আমি নিজের হাতে ধরা মাটির পাখিটির দিকে তাকাইলাম। পাখিটি আমার খুব প্রিয় ছিল। তবু কী মনে করিয়া আমি তাহার নিকট গিয়া বলিলাম, “তুমি কি এই ঘোড়াটি চাও?” সে মাথা নাড়িল। আমি পিতার নিকট গিয়া আরও কিছু টাকা চাহিলাম। পিতা আমার মুখের দিকে চাহিয়া টাকা দিলেন। আমি ঘোড়াটি কিনিয়া বালকটির হাতে দিলাম।
বালকটির মুখে যে হাসি ফুটিয়া উঠিয়াছিল, তাহা আজও মনে আছে। সে কিছু বলিতে পারে নাই, কেবল খেলনাটি বুকে চাপিয়া ধরিয়াছিল। পিতা আমার মাথায় হাত রাখিয়া বলিয়াছিলেন, “নিজে আনন্দিত হওয়া ভালো; অন্যের মুখে আনন্দ ফুটাইতে পারা আরও ভালো।” সেদিন প্রথম অনুভব করিয়াছিলাম, আনন্দ ভাগ করিলে কমে না; বরং তাহার আলো আরও দূর পর্যন্ত ছড়াইয়া পড়ে।
উৎসবের দিনগুলি আমাদের শিখাইয়াছিল, মানুষের প্রকৃত সম্পদ তাহার সঞ্চিত দ্রব্য নহে, বরং ভাগ করিবার ক্ষমতা। এক থালা খাবার, একটি ছোট খেলনা, কয়েকটি স্নেহের বাক্য কিংবা কারও পাশে বসিয়া থাকিবার সময়—এই সামান্য বিষয়গুলিই মানুষের জীবনকে অর্থবহ করিয়া তোলে। শৈশবে আমরা এই শিক্ষা বই পড়িয়া পাই নাই; পাইয়াছি মানুষের মুখের হাসি দেখিয়া।
৮. দাদির গল্পের রাত
আমাদের বাড়ির পশ্চিম কোণে একটি ছোট ঘরে দাদি বাস করিতেন। তাঁহার বয়স তখন অনেক হইয়াছে। চুল সম্পূর্ণ সাদা, মুখে অসংখ্য বলিরেখা, চোখে বয়সের কারণে সামান্য ঝাপসা দৃষ্টি। কিন্তু স্মৃতিশক্তি ছিল আশ্চর্যরকম প্রখর। গ্রামের কোন পরিবারে কী ঘটনা ঘটিয়াছিল, কোন বৎসর বন্যায় কোন জমি ভাসিয়া গিয়াছিল, কার বিবাহে কী ঘটিয়াছিল—সবই তাঁহার মনে ছিল। আমরা শিশুরা তাঁহার পাশে বসিয়া গল্প শুনিতে ভালোবাসিতাম।
শীতের রাত্রিতে দাদির ঘরে পাটি বিছানো হইত। মাঝখানে থাকিত একটি কুপিবাতি। আমরা কয়েকজন নাতি-নাতনি তাঁহার চারিদিকে গোল হইয়া বসিতাম। দাদি কখনো রাজপুত্রের গল্প বলিতেন, কখনো হারানো রাজ্যের, কখনো সাহসী কৃষকের, কখনো আবার এমন এক দরিদ্র মানুষের কাহিনি বলিতেন, যিনি নিজের শেষ রুটিখানিও ক্ষুধার্ত পথিককে দান করিয়াছিলেন। গল্পের প্রতিটি চরিত্র যেন আমাদের চোখের সামনে জীবন্ত হইয়া উঠিত।
এক রাতে দাদি একটি মেয়ের গল্প বলিলেন। মেয়েটির নাম ছিল কুসুম। তাহার পরিবার ছিল দরিদ্র, কিন্তু সে প্রতিদিন বাড়ির পাশে একটি শিউলিগাছের যত্ন লইত। একদিন প্রবল ঝড়ে গাছটির অধিকাংশ ডাল ভাঙিয়া গেল। গ্রামের লোকেরা বলিল, গাছটি আর বাঁচিবে না। কিন্তু কুসুম প্রতিদিন গাছটির গোড়ায় জল দিত, মাটি আলগা করিত এবং ভাঙা ডালগুলি সরাইয়া রাখিত। বহু দিন পরে গাছটিতে নতুন পাতা গজাইল, পরের বসন্তে ফুল ফুটিল।
গল্পের শেষে দাদি বলিলেন, “মানুষের জীবনেও ঝড় আসে। তখন অনেকে ভাবে, সব শেষ হইয়া গেল। কিন্তু যে মানুষ আশার যত্ন লইতে জানে, সে আবার নতুন করিয়া বাঁচিবার পথ খুঁজিয়া পায়।” আমি দাদির কোলে মাথা রাখিয়া শুইয়া ছিলাম। কথাগুলি সম্পূর্ণ বুঝি নাই, কিন্তু মনে হইয়াছিল, অন্ধকারের মধ্যেও কোনো এক অদৃশ্য আলো আছে।
দাদি প্রায়ই নিজের শৈশবের কথাও বলিতেন। তাঁহার সময়ে নাকি গ্রামে এত রাস্তা ছিল না, বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল কম, চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল দুর্বল। বন্যা হইলে মানুষ দিনের পর দিন উঁচু জমিতে আশ্রয় লইত। দুর্ভিক্ষের বৎসরে অনেক পরিবার অনাহারে দিন কাটাইত। সেইসব কথা শুনিয়া আমরা বিস্মিত হইতাম। আমাদের কাছে দারিদ্র্য ছিল নতুন জামা না পাওয়া কিংবা মেলায় কম টাকা লইয়া যাওয়া; দাদির কাছে দারিদ্র্য ছিল বাঁচিয়া থাকিবার সংগ্রাম।
একদিন আমি তাঁহাকে প্রশ্ন করিয়াছিলাম, “দাদি, তোমার শৈশব কি আমাদের শৈশবের চেয়ে ভালো ছিল?” তিনি দীর্ঘক্ষণ নীরব থাকিয়া বলিয়াছিলেন, “প্রত্যেক শৈশবেরই নিজস্ব আলো থাকে। আমাদের কষ্ট ছিল বেশি, কিন্তু মানুষের হাতে সময় ছিল। সন্ধ্যায় সবাই একসঙ্গে বসিত, প্রতিবেশীর বিপদে মানুষ ছুটিয়া যাইত। এখন তোমাদের কত নতুন জিনিস হইয়াছে, কিন্তু মানুষের মন যেন অনেক সময় একে অন্যের কাছে পৌঁছাইতে পারে না।”
তাঁহার কথার অর্থ তখন সম্পূর্ণ বুঝিতে পারি নাই। এখন বুঝি, কোনো যুগই সম্পূর্ণ সুখের নহে। অতীতেরও দুঃখ ছিল, বর্তমানেরও দুঃখ আছে। কিন্তু অতীতকে স্মরণ করিলে আমরা এমন কিছু মূল্যবোধ খুঁজিয়া পাই, যাহা সময়ের পরিবর্তনে হারাইয়া যাওয়া উচিত নহে। মানুষের প্রতি মমতা, প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ানো, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো এবং প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা—এই বিষয়গুলি কোনো যুগেই পুরাতন হয় না।
দাদি একসময় অসুস্থ হইয়া পড়িলেন। প্রথম দিকে তিনি আমাদের গল্প শুনাইতেন, পরে কথা বলিতে কষ্ট হইত। আমরা তাঁহার বিছানার পাশে বসিয়া থাকিতাম। তিনি আমার হাত ধরিয়া রাখিতেন, কখনো চোখ বন্ধ করিতেন, কখনো মৃদু হাসিতেন। সেই হাসির মধ্যে যেন বহু বৎসরের অভিজ্ঞতা, ভালোবাসা এবং বিদায়ের প্রস্তুতি একত্র হইয়া থাকিত।
একদিন সন্ধ্যায় দাদি আমাকে ডাকিলেন। আমি কাছে গেলে তিনি বলিলেন, “বড় হইলে অনেক দূরে যাইতে হইবে। কিন্তু নিজের মাটি ভুলিয়া যাইও না। মানুষ যত দূরেই যাক, তাহার শিকড় কোথায়, তাহা জানা প্রয়োজন।” আমি তাঁহার কথা শুনিয়া মাথা নাড়িলাম। তখন মনে হইয়াছিল, আমি কখনোই এই গ্রাম ছাড়িয়া যাইব না। কিন্তু জীবন মানুষের শপথকে সব সময় মানিয়া চলে না।
৯. প্রথম বিচ্ছেদের বেদনা
আমার শৈশবের সবচেয়ে বেদনাময় স্মৃতিগুলির একটি দাদির মৃত্যু। শীতের শেষদিকে এক ভোরে তিনি নিঃশব্দে চলিয়া গেলেন। আগের রাত্রিতে আমি তাঁহার পাশে বসিয়া গল্প শুনিবার অপেক্ষা করিতেছিলাম, কিন্তু তিনি ঘুমাইয়া পড়িয়াছিলেন। সকালে মাতা আমাকে ডাকিয়া বলিলেন, দাদি আর আমাদের মধ্যে নাই। কথাটি শুনিয়া প্রথমে কিছুই বুঝিতে পারি নাই। মনে হইয়াছিল, তিনি হয়তো অন্য ঘরে গিয়াছেন, কিছুক্ষণ পরে ফিরিয়া আসিবেন।
বাড়ির উঠানে মানুষের ভিড় জমিল। নারীদের কান্না, পুরুষদের গম্ভীর মুখ, আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা—সব মিলিয়া ঘরখানি অপরিচিত হইয়া উঠিল। আমি দাদির ঘরের দরজায় দাঁড়াইয়া তাঁহার বিছানার দিকে চাহিয়া ছিলাম। বালিশের পাশে তাঁহার ব্যবহৃত চশমাটি পড়িয়া ছিল, মাটির কলসিতে অল্প জল ছিল, আর দেওয়ালে ঝুলিতেছিল পুরাতন একটি কাপড়ের থলি। এই সামান্য জিনিসগুলি দেখিয়া আমার মনে হইল, মানুষ যদি চলিয়াই যান, তবে তাঁহার জিনিসগুলি এমনভাবে থাকিয়া যায় কেন?
মৃত্যু সম্পর্কে আমার কোনো স্পষ্ট ধারণা ছিল না। আমি মাকে প্রশ্ন করিলাম, “দাদি আবার ফিরিয়া আসিবেন না?” মাতা আমাকে বুকে টানিয়া লইলেন। তিনি উত্তর দিতে পারিলেন না। তাঁহার চোখ দিয়া অশ্রু ঝরিয়া পড়িল। সেই প্রথম আমি বুঝিলাম, বড়দেরও এমন দুঃখ হয়, যাহার কোনো সহজ উত্তর নাই।
দাদির মৃত্যুর পর অনেক দিন আমি তাঁহার ঘরে যাইতে ভয় পাইতাম। আবার কখনো সন্ধ্যায় মনে হইত, তিনি বুঝি বিছানায় বসিয়া আমাদের জন্য অপেক্ষা করিতেছেন। কুপিবাতির আলোয় ঘরের কোণে ছায়া পড়িলে মনে হইত, সেই ছায়ার মধ্যে তাঁহার অবয়ব দেখা যাইতেছে। আমি ছুটিয়া গিয়া মাকে বলিতাম, “দাদি কি আসিয়াছেন?” মাতা আমার মাথায় হাত বুলাইয়া বলিতেন, “তিনি এখন তোমার স্মৃতিতে থাকিবেন।”
স্মৃতি কী, তখন বুঝি নাই। মৃত মানুষ কীভাবে স্মৃতিতে থাকেন, তাহাও জানিতাম না। কিন্তু ক্রমে দেখিলাম, দাদি না থাকিলেও তাঁহার গল্পগুলি রহিয়া গিয়াছে। শিউলিগাছ দেখিলে কুসুমের কথা মনে পড়িত, শীতের রাতে কুপিবাতি জ্বলিলে তাঁহার কণ্ঠস্বর শুনিতে পাইতাম, আর কোনো দরিদ্র মানুষকে সাহায্য করিতে দেখিলে মনে হইত, দাদি যেন নীরবে হাসিতেছেন। মানুষ হয়তো দেহে চলিয়া যান, কিন্তু তাঁহার ভালোবাসা অন্য মানুষের আচরণে বাঁচিয়া থাকে।
দাদির মৃত্যুর কয়েক মাস পরে নীলয়ের পিতা কাজের সন্ধানে অন্য জেলায় যাইবার সিদ্ধান্ত লইলেন। তাহাদের পরিবারে অর্থকষ্ট বাড়িয়াছিল। নীলয়ও পরিবারের সঙ্গে চলিয়া যাইবে। সংবাদটি শুনিয়া আমার মনে হইল, পৃথিবী যেন একের পর এক প্রিয় জিনিস আমার কাছ হইতে কেড়ে লইতেছে। দাদির শূন্যতা তখনও পূরণ হয় নাই, তাহার উপর বন্ধুর বিদায়।
বিদায়ের দিন নীলয় আমার বাড়িতে আসিল। তাহার হাতে একটি ছোট কাঠের বাক্স। সে বলিল, “ইহার মধ্যে আমাদের কয়েকটি স্মৃতি রাখিবি। যখন আমার কথা মনে পড়িবে, খুলিয়া দেখিবি।” বাক্সের মধ্যে ছিল দুইটি কাগজের নৌকা, একটি ভাঙা পেন্সিল, মেলার একটি টিকিট এবং আমাদের একসঙ্গে আঁকা একটি ছবি। ছবিতে দুইটি শিশু নদীর পাশে দাঁড়াইয়া আছে, মাথার উপরে একটি বিশাল সূর্য।
আমি তাহাকে বলিলাম, “তুই যাইবি না। আমরা অন্য কোথাও থাকিবার ব্যবস্থা করিব।” নীলয় নীরবে আমার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। সে জানিত, তাহার যাওয়া আটকাইবার ক্ষমতা আমাদের কারও নাই। শেষে বলিল, “দূরে থাকিলেই কি বন্ধুত্ব শেষ হইয়া যায়?” আমি উত্তর দিতে পারিলাম না। আমার চোখে জল আসিতেছিল। সে আমার হাত ধরিয়া বলিল, “বড় হইয়া একদিন আবার দেখা হইবে।”
পরদিন সকালে তাহারা গরুর গাড়িতে করিয়া রওনা হইল। আমি গ্রামের রাস্তার ধারে দাঁড়াইয়া ছিলাম। গাড়িটি ধীরে ধীরে দূরে চলিয়া গেল। নীলয় কয়েকবার পিছনে ফিরিয়া হাত নাড়িল। আমি হাত নাড়িতে নাড়িতে দেখিলাম, গাড়িটি বাঁকের আড়ালে অদৃশ্য হইয়া গেল। তারপরও অনেকক্ষণ সেই পথের দিকে চাহিয়া থাকিলাম। মনে হইল, পৃথিবীর একটি অংশ আমার চোখের সামনেই হারাইয়া গেল।
সেই দিন আমি প্রথম বুঝিলাম, বিচ্ছেদ কেবল কাউকে হারানো নহে; বিচ্ছেদ মানে পরিচিত পৃথিবীর একটি অংশের পরিবর্তন। যে পথ দিয়া প্রতিদিন দুই বন্ধু বিদ্যালয়ে যাইত, সেই পথে এখন একজন একা চলিবে। যে খেলায় দুইজনের হাসি মিশিয়া থাকিত, সেখানে একজনের নীরবতা দেখা দিবে। যে স্বপ্ন দুইজন মিলে গড়িয়াছিল, তাহার কিছু অংশ হয়তো আর কখনো বাস্তব হইবে না।
১০. সময়ের পরিবর্তন
নীলয় চলিয়া যাইবার পর প্রথম কয়েক সপ্তাহ আমার কাছে অত্যন্ত দীর্ঘ মনে হইত। বিদ্যালয়ে তাহার নির্দিষ্ট আসনটি খালি থাকিত। টিফিনের সময় অন্য বন্ধুদের সঙ্গে বসিলেও মনে হইত, কিছু একটা অনুপস্থিত। মাঠে খেলার সময় বল দূরে চলিয়া গেলে তাহাকে খুঁজিবার জন্য যে বন্ধুটি সবার আগে ছুটিত, সে আর নাই। আমবাগানের পাশ দিয়া যাইবার সময় সেই দিনের দৌড়াদৌড়ির কথা মনে পড়িত। স্মৃতি কখনো কখনো এমনই নিষ্ঠুর; যে আনন্দ আর ফিরিয়া আসিবে না, তাহার দৃশ্য বারবার চোখের সামনে আনিয়া দাঁড় করায়।
পিতা আমাকে পড়াশোনায় মনোযোগী হইতে বলিতেন। আমি আবার বইখাতা লইয়া বসিতাম। ধীরে ধীরে বিদ্যালয়ের নিয়মিত জীবনে ফিরিয়া আসিলাম। নতুন বন্ধু হইল, নতুন খেলা শুরু হইল, পরীক্ষার প্রস্তুতি চলিতে লাগিল। মানুষের মন আশ্চর্যভাবে নিজেকে মানাইয়া লইতে পারে। দুঃখ সম্পূর্ণ দূর হয় না, কিন্তু তাহার পাশে নতুন অভিজ্ঞতা জায়গা করিয়া লয়।
বৎসর ঘুরিয়া গেল। আম্রবীথিতে আবার মুকুল আসিল, নদীতে আবার বর্ষার জল বাড়িল, শীতের সকালে আবার কুয়াশা নামিল। প্রকৃতি যেন আমাদের ব্যক্তিগত শোকের প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন। গাছের পাতা ঝরিয়া পড়ে, আবার নতুন পাতা জন্মে; নদী ভাঙে, আবার পলি জমে; সূর্য অস্ত যায়, আবার উদিত হয়। মানুষের জীবনও সেই চক্রের অংশ। আমরা ভাবি, আমাদের দুঃখে পৃথিবী থামিয়া যাইবে, কিন্তু পৃথিবী আপন নিয়মে চলিতে থাকে।
আমি যখন উচ্চবিদ্যালয়ে উঠিলাম, তখন পড়াশোনার চাপ বাড়িল। পিতা আমাকে আরও যত্নসহকারে পড়াইতে লাগিলেন। তিনি বলিতেন, “জীবনে নিজের পায়ে দাঁড়াইতে শিখিতে হইবে। দারিদ্র্য লজ্জার নহে, কিন্তু চেষ্টা না করিয়া পরাজয় মানিয়া লওয়া দুঃখজনক।” তাঁহার কথা শুনিয়া আমি ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ভাবিতে শিখিলাম। একদিন এই গ্রাম ছাড়িয়া দূরে যাইতে হইবে, উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করিতে হইবে, নিজের জীবনের দায়িত্ব নিজেকেই লইতে হইবে—এই ধারণা ক্রমে স্পষ্ট হইল।
কিন্তু সেই সঙ্গে শৈশবের সরলতা ধীরে ধীরে দূরে সরিয়া যাইতে লাগিল। আগে যাহা কেবল আনন্দের বিষয় ছিল, তাহার মধ্যে প্রতিযোগিতা প্রবেশ করিল। পরীক্ষায় কে প্রথম হইবে, কার ফল ভালো হইবে, কে বৃত্তি পাইবে—এইসব প্রশ্ন আমাদের কথাবার্তার অংশ হইয়া উঠিল। বন্ধুদের মধ্যে আগের মতো অকৃত্রিম হাসি থাকিলেও কখনো কখনো তুলনার ছায়া দেখা দিত। বড় হইবার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ নিজের অবস্থান বুঝিতে শেখে, কিন্তু সেই সঙ্গে অন্যের সঙ্গে নিজের হিসাব মিলাইবার অভ্যাসও জন্মে।
একদিন বিদ্যালয়ের মাঠে বসিয়া আমি পুরাতন দিনগুলির কথা ভাবিতেছিলাম। নীলয়ের অনুপস্থিতি তখন আর প্রতিদিনের তীব্র ব্যথা ছিল না, কিন্তু তাহার স্মৃতি নীরবে আমার সঙ্গে থাকিত। আমি বুঝিতে পারিলাম, সময়ের কাজ ভুলাইয়া দেওয়া নহে; সময় আমাদের শোকের সঙ্গে বাঁচিতে শেখায়। যে বেদনা একদিন সহ্য করা অসম্ভব বলিয়া মনে হইত, তাহাই পরে স্মৃতির একটি অধ্যায় হইয়া যায়।
বিদ্যালয়ের শেষ পরীক্ষার পর পিতা আমাকে শহরের কলেজে পড়িবার জন্য পাঠাইবার ব্যবস্থা করিলেন। আমাদের গ্রামের অধিকাংশ শিশু মাধ্যমিকের পর আর পড়াশোনা চালাইতে পারিত না। পিতা বহু বৎসরের সঞ্চয় হইতে আমার জন্য অর্থ জোগাড় করিলেন। মাতা আমার কাপড় গুছাইয়া দিলেন, কয়েকটি শুকনো খাবার তৈরি করিলেন, আর দাদি বেঁচে থাকিলে যে কাপড়ের থলিটি ব্যবহার করিতেন, তাহার মতো একটি ছোট থলিতে প্রয়োজনীয় জিনিস রাখিয়া দিলেন।
যাত্রার আগের রাতে ঘুম আসিল না। বাড়ির উঠানে বসিয়া আকাশের দিকে চাহিয়া ছিলাম। বাঁশঝাড়ে বাতাসের শব্দ, দূরের কুকুরের ডাক, পুকুরের জল নড়িবার মৃদু আওয়াজ—সবকিছু যেন আমাকে বিদায় জানাইতেছিল। আমি জানিতাম, শহরে গেলে নতুন জীবন শুরু হইবে। কিন্তু এই গৃহের প্রতিটি কোণ, প্রতিটি গন্ধ, প্রতিটি শব্দ আমার জীবনের অংশ হইয়া গিয়াছে। তাহাদের পিছনে ফেলিয়া যাওয়া সহজ হইবে না।
ভোরে মাতা আমার কপালে চুম্বন করিলেন। পিতা কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়াইয়া থাকিয়া বলিলেন, “যেখানেই থাকো, মানুষের মতো মানুষ হইও।” কথাটি বলিয়া তিনি মুখ ফিরাইয়া লইলেন। আমি তাঁহার চোখে জল দেখিয়াছিলাম কি না, আজ নিশ্চিত বলিতে পারি না। কিন্তু তাঁহার কণ্ঠের ভার আমাকে বুঝাইয়া দিয়াছিল, আমার যাত্রা কেবল আমার একার যাত্রা নহে; ইহার সঙ্গে জড়িত রহিয়াছে পিতামাতার বহু বৎসরের স্বপ্ন ও ত্যাগ।
গাড়ি যখন গ্রামের শেষ প্রান্ত অতিক্রম করিল, তখন আমি পিছনে ফিরিয়া চাহিলাম। মাটির বাড়িগুলি ছোট হইয়া আসিতেছিল, বটবৃক্ষের মাথা দিগন্তে মিলাইয়া যাইতেছিল, পরিচিত পথটি ধুলার মধ্যে হারাইতেছিল। মনে হইল, আমার শৈশব যেন সেই পথের ধারে দাঁড়াইয়া হাত নাড়িতেছে। আমি চোখ মুছিয়া সামনে ফিরিলাম। সামনে ছিল অজানা পৃথিবী; পিছনে থাকিয়া গেল আমার সমস্ত পরিচিত আলো।
১১. শহরের ভিড়ে হারাইয়া যাওয়া গ্রাম
শহরে আসিয়া প্রথম কয়েক মাস আমার কাছে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা ছিল। এখানে মানুষের ভিড়, উঁচু ভবন, দোকানের আলো, যানবাহনের শব্দ, ব্যস্ত রাস্তা—সবকিছুই গ্রামের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। সকাল হইতে রাত পর্যন্ত মানুষ ছুটিতেছে। কেহ বিদ্যালয়ে, কেহ কার্যালয়ে, কেহ ব্যবসায়, কেহ জীবিকার সন্ধানে। অথচ এত মানুষের মাঝেও এক ধরনের নিঃসঙ্গতা অনুভব করিতাম। গ্রামের পথে পরিচিত মানুষ দেখিলে যে স্বাভাবিক হাসি ফুটিয়া উঠিত, এখানে সেই হাসি যেন অপরিচিত ভাষা।
প্রথম দিকে রাত্রিবেলা ঘুমাইতে পারিতাম না। গ্রামের নীরবতার পরিবর্তে এখানে সারারাত্রি শব্দ চলিত। কখনো গাড়ির হর্ন, কখনো পাশের ঘরের মানুষের কথাবার্তা, কখনো দূরের কোনো যন্ত্রের আওয়াজ। জানালা খুলিয়া আকাশের দিকে চাহিলে কয়েকটি অস্পষ্ট তারা দেখা যাইত। মনে পড়িত গ্রামের সেই বিশাল আকাশ, যেখানে মনে হইত, পৃথিবীর সমস্ত নক্ষত্র যেন আমাদের গৃহের উপর ঝুঁকিয়া রহিয়াছে।
পড়াশোনার পাশাপাশি আমাকে নানা বিষয়ে নিজের দায়িত্ব লইতে হইল। বাজার করা, খরচের হিসাব রাখা, সময়মতো শ্রেণিতে যাওয়া, অসুস্থ হইলে নিজের যত্ন লওয়া—এইসব কাজের মধ্যে বুঝিতে পারিলাম, বড় হইবার অর্থ কেবল বয়স বৃদ্ধি নহে। বড় হইবার অর্থ, নিজের কষ্টের ভার নিজে বহন করিতে শেখা। মায়ের রান্না, পিতার উপদেশ, ঘরের পরিচিত পরিবেশ—সবকিছুর মূল্য তখন আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করিতে লাগিলাম।
ছুটিতে বাড়ি ফিরিবার জন্য দিন গুনিতাম। পরীক্ষার পর যখন গ্রামে যাইবার সুযোগ হইত, তখন বাসের জানালায় বসিয়া পরিচিত সবুজ মাঠ দেখিবার জন্য অপেক্ষা করিতাম। দূরে নদীর রেখা দেখা গেলে বুকের ভিতর আনন্দের ঢেউ উঠিত। গ্রামের কাছাকাছি আসিলে মনে হইত, বহু দিন পরে নিজের শরীরে নিজের শ্বাসের শব্দ শুনিতে পাইতেছি। বাড়ির উঠানে পা রাখিয়া মায়ের মুখ দেখিলে সমস্ত ক্লান্তি দূর হইয়া যাইত।
কিন্তু প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তনের চিহ্নও চোখে পড়িত। যে মেঠোপথ দিয়া আমরা বিদ্যালয়ে যাইতাম, তাহার কিছু অংশে ইট বসানো হইয়াছে। পুরাতন বটবৃক্ষের পাশের জমিতে নতুন দোকান উঠিয়াছে। বাঁশঝাড়ের একাংশ কাটা পড়িয়াছে। নদীর তীর ভাঙিয়া গিয়াছে, আগের বালুচর আর তেমন দেখা যায় না। গ্রামের শিশুরা এখন অন্য ধরনের খেলনা লইয়া ব্যস্ত।
এই পরিবর্তনকে অস্বীকার করিবার কোনো কারণ ছিল না। মানুষের জীবন উন্নতির জন্য পরিবর্তন প্রয়োজন। রাস্তা হওয়া ভালো, বিদ্যালয়ে নতুন ভবন হওয়া ভালো, চিকিৎসার ব্যবস্থা বাড়া ভালো। তবু পরিবর্তনের মধ্যে দাঁড়াইয়া আমি অনুভব করিতাম, কিছু জিনিস এমন আছে যাহা হারাইলে আর আগের মতো ফিরিয়া পাওয়া যায় না। পুরাতন পথের বাঁক, বটগাছের ছায়া, নদীর নির্দিষ্ট ঘাট কিংবা প্রতিবেশীর উঠানে সন্ধ্যার আড্ডা—এইসবের সঙ্গে জড়াইয়া ছিল আমার জীবনের এমন এক অধ্যায়, যাহা নতুন কোনো আয়োজন দ্বারা প্রতিস্থাপিত হইতে পারে না।
মাতা তখনও আগের মতোই সংসারের কাজ করিতেন, কিন্তু তাঁহার চুলে আরও সাদা রেখা দেখা দিয়াছিল। পিতার চোখে চশমার কাচ মোটা হইয়াছে, হাঁটার গতি কিছুটা ধীর হইয়াছে। আমি যখন বাড়ি ফিরিতাম, তাঁহারা আনন্দে ব্যস্ত হইয়া পড়িতেন। মাতা আমার পছন্দের খাবার রান্না করিতেন, পিতা পড়াশোনার খোঁজ লইতেন। আমি কখনো বিরক্ত হইয়া বলিতাম, “এত চিন্তার প্রয়োজন নাই।” পরে নিজের কথার জন্য অনুতপ্ত হইতাম। কারণ, তাঁহাদের চিন্তার মধ্যেই লুকাইয়া ছিল আমার প্রতি অগাধ ভালোবাসা।
একবার শহরে ফিরিবার সময় মাতা আমার ব্যাগে গোপনে কিছু টাকা রাখিয়া দিয়াছিলেন। আমি জানিবার পর তাঁহাকে বলিলাম, আমার প্রয়োজন নাই। তিনি মৃদু হাসিয়া বলিলেন, “মায়ের কাছে সন্তানের প্রয়োজন শেষ হয় না।” কথাটি শুনিয়া আমার বুক ভারী হইয়া উঠিল। শহরের জীবন আমাকে স্বনির্ভর হইতে শিখাইতেছিল, কিন্তু মায়ের চোখে আমি তখনও সেই ছোট্ট শিশুটি, যে অসুস্থ হইলে তাঁহার হাত ধরিয়া ঘুমাইত।
সেই সময় বুঝিতে শুরু করিলাম, মানুষের জীবনে দুটি সময় পাশাপাশি বাস করে। একটি বর্তমান, যেখানে দায়িত্ব, কাজ ও ভবিষ্যতের চিন্তা; অন্যটি অতীত, যেখানে আমাদের সমস্ত প্রথম অভিজ্ঞতা, সরলতা ও নিরাপত্তা সঞ্চিত থাকে। বর্তমান আমাদের সামনে চলিতে শেখায়, অতীত আমাদের শিকড়ের কথা স্মরণ করাইয়া দেয়। যাহার জীবনে এই দুইয়ের মধ্যে কোনো সম্পর্ক থাকে না, সে হয়তো অনেক দূর যায়, কিন্তু নিজের পথের অর্থ হারাইয়া ফেলিবার আশঙ্কা থাকে।
১২. পুরাতন বাক্সের ভিতরে
বহু বৎসর পরে একবার বাড়ি ফিরিয়া আমি পিতার সেই পুরাতন কাঠের বাক্সটি আবার খুলিলাম। বাক্সটি এখন আরও জীর্ণ। কাঠের কোণে ধুলা জমিয়াছে, তালার রং মলিন হইয়াছে। পিতা তখন অবসর গ্রহণ করিয়াছেন। বিদ্যালয়ের কাজ আর তাঁহাকে নিয়মিত বাহিরে লইয়া যায় না। তিনি অধিকাংশ সময় বই পড়েন, পুরাতন কাগজপত্র গুছান এবং বিকালে বাড়ির সামনের চেয়ারে বসিয়া গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথা বলেন।
বাক্সের ভিতরে আগের বইগুলি ছিল, ছিল সেই ভাঙা ঘড়ি এবং কয়েকটি পুরাতন চিঠি। তাহার নিচে একটি ছোট খাম পাইয়া গেলাম। খামের ভিতরে ছিল আমার শৈশবের একটি ছবি। ছবিতে আমি খুব ছোট, পরনে অর্ধহাতা জামা, পায়ে স্যান্ডেল নাই, মুখে একগাল হাসি। পাশে পিতা দাঁড়াইয়া আছেন, তাঁহার হাত আমার কাঁধে। পিছনে আমাদের মাটির বাড়ি এবং উঠানের সেই শিউলিগাছ।
ছবিটির দিকে চাহিয়া আমি দীর্ঘক্ষণ নীরব থাকিলাম। সেই শিশুটির চোখে ভবিষ্যতের কোনো ভয় ছিল না। সে জানিত না, একদিন তাহাকে বিচ্ছেদ সহ্য করিতে হইবে, প্রিয়জন হারাইতে হইবে, জীবিকার জন্য সংগ্রাম করিতে হইবে, নিজের ব্যর্থতার সঙ্গে লড়িতে হইবে। সে কেবল জানিত, পিতার হাত তাহার কাঁধে আছে এবং বাড়ির উঠানে মাতা অপেক্ষা করিতেছেন। এই সামান্য বিশ্বাসই তাহার কাছে পৃথিবীর সমস্ত নিরাপত্তার সমান ছিল।
ছবির পিছনে পিতার হাতের লেখা কয়েকটি শব্দ ছিল—“আমার ছেলের ছোটবেলার স্মৃতি।” অক্ষরগুলি কিছুটা কাঁপা, কালি ফিকে হইয়া গিয়াছে। সেই লেখা পড়িয়া আমার চোখ ভিজিয়া উঠিল। পিতা হয়তো ছবিটি বহু বৎসর যত্ন করিয়া রাখিয়াছিলেন। আমি কখনো জানিতাম না, আমার শৈশব তাঁহার কাছেও এমন মূল্যবান ছিল। সন্তান যখন বড় হয়, পিতা-মাতা তখন নীরবে তাহার ছোটবেলার স্মৃতিগুলি আঁকড়াইয়া ধরেন। তাঁহাদের কাছে সন্তান যতই বয়সে বাড়ুক, একদিনের ছোট্ট হাতটি চিরকাল স্মৃতির মধ্যে জীবিত থাকে।
আমি পিতার পাশে বসিয়া ছবিটি তাঁহাকে দেখাইলাম। তিনি ছবির দিকে চাহিয়া মৃদু হাসিলেন। বলিলেন, “তুমি তখন সারাদিন দৌড়াইতে। তোমাকে ঘরে রাখাই কঠিন ছিল।” আমি হাসিয়া বলিলাম, “আপনি কি খুব রাগ করিতেন?” তিনি মাথা নাড়িয়া বলিলেন, “রাগ করিতাম, আবার তোমাকে খুঁজিতামও। তোমরা যখন খেলিতে, তখন ভাবিতে—এই দিনগুলি যদি আরেকটু দীর্ঘ হইত!”
পিতার কথায় আমি স্তব্ধ হইয়া গেলাম। শৈশবে আমরা বড় হইতে চাই, কারণ বড়দের মতো স্বাধীনতা, ক্ষমতা ও সম্মান লাভ করিবার স্বপ্ন দেখি। অথচ আমাদের পিতামাতা আমাদের শৈশবকে দীর্ঘ করিয়া রাখিতে চান। তাঁহারা জানেন, একদিন শিশু নিজের পথ ধরিয়া চলিয়া যাইবে, আর তাঁহাদের ঘরে ফিরিয়া আসিবে কেবল ছুটির দিনে, উৎসবে কিংবা প্রয়োজনের সময়ে। এই বিদায়ের প্রস্তুতি তাঁহারা আমাদের জন্মের দিন হইতেই নীরবে গ্রহণ করিতে থাকেন।
বাক্সের আরেকটি কোণে নীলয়ের দেওয়া সেই ছোট স্মৃতিবাক্সটি ছিল। এত বৎসর পরও আমি তাহা ফেলে দিই নাই। কাঠের গায়ে আঁচড় পড়িয়াছে, কাগজের নৌকাগুলি ভঙ্গুর হইয়া গিয়াছে, পুরাতন ছবির রং ফিকে। কিন্তু সেই বাক্স খুলিলে মনে হয়, সময় যেন মুহূর্তের জন্য থামিয়া গিয়াছে। নীলয় এখনও আমার পাশে বসিয়া আছে, আমাদের সামনে নদী, হাতে কাগজের নৌকা, আর দূরে আকাশের মধ্যে বিশাল এক সূর্য।
আমি বহুবার তাহার খোঁজ করিবার কথা ভাবিয়াছি। কিন্তু জীবনের ব্যস্ততা, ঠিকানা পরিবর্তন, যোগাযোগের অভাব—নানা কারণে তাহা করা হয় নাই। কখনো মনে হইয়াছে, সে হয়তো আমাকে ভুলিয়া গিয়াছে। আবার মনে হইয়াছে, শৈশবের বন্ধুকে ভুলিয়া যাওয়া কি এত সহজ? হয়তো তাহারও কোনো পুরাতন বাক্সে আমাদের সেই ছবির অনুরূপ একটি ছবি রহিয়াছে। হয়তো কোনো বর্ষার দিনে সেও কাগজের নৌকার কথা ভাবিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
মানুষের জীবনে কিছু সম্পর্কের বর্তমান উপস্থিতি থাকে না, কিন্তু তাহাদের অস্তিত্ব সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয় না। বন্ধুটি পাশে নাই, তবু তাহার শেখানো সাহস মনে থাকে। দাদি আর গল্প শুনান না, তবু তাঁহার উপদেশ জীবনের কঠিন মুহূর্তে পথ দেখায়। পিতা-মাতা ক্রমে বৃদ্ধ হন, তবু তাঁহাদের স্নেহের স্মৃতি আমাদের ভিতরে শিশুটিকে বাঁচাইয়া রাখে। এইভাবেই অতীত বর্তমানের মধ্যে নীরবে বসবাস করে।
১৩. ফিরে দেখা এক বিকাল
সেদিন বিকালে আমি একা হাঁটিতে বাহির হইলাম। বহু দিন পরে গ্রামের পথ দিয়া উদ্দেশ্যহীনভাবে চলিবার ইচ্ছা হইয়াছিল। সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলিয়া পড়িতেছে। ধানের খেতে বাতাস লাগিয়া ঢেউ উঠিতেছে। দূরে কয়েকটি শিশু বল লইয়া খেলিতেছে। তাহাদের হাসির শব্দ শুনিয়া আমার নিজের শৈশবের কথা মনে পড়িল। কিছুক্ষণ দাঁড়াইয়া তাহাদের খেলা দেখিলাম। তাহাদের মধ্যে একজন বল ধরিতে গিয়া পড়ে গেল, আবার উঠিয়া হাসিতে লাগিল। সেই হাসিতে কোনো লজ্জা নাই, কোনো হিসাব নাই, কোনো কৃত্রিমতা নাই।
আমি ধীরে ধীরে সেই পুরাতন বটবৃক্ষের দিকে গেলাম। গাছটি এখনও দাঁড়াইয়া আছে, যদিও কয়েকটি ডাল শুকাইয়া গিয়াছে। তাহার ছায়ার নিচে বসিবার জন্য একটি পাথরের বেঞ্চ তৈরি হইয়াছে। সেখানে বসিয়া চোখ বন্ধ করিলাম। মনে হইল, বহু দূর হইতে হরিপদবাবুর কণ্ঠস্বর ভেসে আসিতেছে, “বই খুলিয়া বসো।” নীলয় পাশে দাঁড়াইয়া হাসিতেছে, দাদি ঘরের ভিতর হইতে ডাকিতেছেন, আর মাতা উঠান হইতে বলিতেছেন, “সন্ধ্যা হইয়া আসিয়াছে, বাড়ি ফিরিয়া এসো।”
চোখ খুলিয়া দেখি, চারিদিকে সন্ধ্যার ছায়া নামিয়া আসিয়াছে। বাস্তবে সেই কণ্ঠস্বরগুলি নাই। হরিপদবাবু বহু বৎসর পূর্বে অবসর গ্রহণ করিয়া অন্যত্র চলিয়া গিয়াছেন; নীলয় কোথায় আছে, জানি না; দাদি পরলোকগমন করিয়াছেন; আর মাতা-পিতা বয়সের ভারে নত হইয়া পড়িয়াছেন। তবু স্মৃতির মধ্যে তাহারা সকলেই জীবিত। অতীত যেন কোনো মৃত সময় নহে; তাহা আমাদের হৃদয়ের মধ্যে এক অবিনশ্বর বর্তমান।
বটতলা হইতে নদীর দিকে গেলাম। মধুমতীর জল তখন শান্ত। সূর্যাস্তের লাল আভা জলের উপর পড়িয়া এক অদ্ভুত রং সৃষ্টি করিয়াছে। নদীর তীরে দাঁড়াইয়া আমি সেই স্থানটি খুঁজিতে লাগিলাম, যেখানে একদিন নীলয় ও আমি কাগজের নৌকা ভাসাইয়াছিলাম। জায়গাটি এখন অনেক পরিবর্তিত। তীরের কিছু অংশ ভাঙিয়া গিয়াছে, কোথাও নতুন ঘাস জন্মিয়াছে, কোথাও বালু জমিয়াছে। কিন্তু নদীর স্রোত এখনও বহিয়া চলিয়াছে।
আমি পকেট হইতে একটি কাগজ বাহির করিলাম। সঙ্গে রাখা খাতার একটি পাতা ছিঁড়িয়া ছোট নৌকা বানাইলাম। বয়সের কারণে হাতের কাজ আগের মতো দ্রুত হইল না। কয়েকবার ভাঁজ ঠিক করিতে হইল, তারপর নৌকাটি তৈরি হইল। আমি তাহার উপর নিজের নাম লিখিলাম না। কোনো ঠিকানা লিখিলাম না, কোনো গন্তব্যও নির্দিষ্ট করিলাম না। কেবল নৌকাটিকে জলের উপর রাখিয়া দিলাম।
নৌকাটি প্রথমে তীরের কাছে দুলিতে লাগিল। পরে ধীরে ধীরে স্রোতের সঙ্গে ভাসিয়া চলিল। আমি তাহার দিকে চাহিয়া থাকিলাম। অল্পক্ষণের মধ্যেই নৌকাটি দূরে চলিয়া গেল, আর তারপর আর দেখা গেল না। আমার চোখে জল আসিল। কেন কাঁদিতেছি, তাহা নিজেকেও বুঝাইতে পারিলাম না। হয়তো নৌকাটি কেবল কাগজের নৌকা ছিল না; তাহার সঙ্গে ভাসিয়া চলিয়াছিল আমার হারাইয়া যাওয়া শৈশব, বন্ধুত্ব, সরলতা এবং সেই সমস্ত দিন, যাহাদের কাছে ফিরিবার কোনো পথ নাই।
তবু সেই অশ্রুর মধ্যে এক ধরনের শান্তি ছিল। বহু বৎসর পরে যেন নিজের অতীতকে স্পর্শ করিতে পারিলাম। বুঝিলাম, অতীতকে ফিরাইয়া আনা যায় না, কিন্তু তাহার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া যায়। হারানো দিনগুলিকে আঁকড়াইয়া বর্তমানকে অস্বীকার করিবার প্রয়োজন নাই; বরং সেই দিনগুলির শিক্ষা লইয়া বর্তমানকে আরও সুন্দর করিয়া তোলা যায়।
নদীর তীরে দাঁড়াইয়া আমি মনে মনে নীলয়কে বলিলাম, “বন্ধু, তুই যেখানে থাকিস, ভালো থাকিস। আমাদের সেই কাগজের নৌকা হয়তো বহু আগেই ডুবিয়া গিয়াছে, কিন্তু আমাদের বন্ধুত্বের স্মৃতি এখনও ভাসিয়া আছে।” কথাগুলি বাতাসে মিলাইয়া গেল। নদী কোনো উত্তর দিল না। তবু মনে হইল, দূরের স্রোতের মধ্যে কোথাও যেন একটি পরিচিত হাসি শুনিতে পাইলাম।
১৪. শৈশবের কাছে আমার ঋণ
জীবনের পথে চলিতে চলিতে মানুষ অনেক কিছু শিখে। বিদ্যালয় তাহাকে জ্ঞান দেয়, কর্মক্ষেত্র দায়িত্ব শেখায়, সমাজ তাহাকে মানুষের সঙ্গে চলিবার নিয়ম শেখায়, আর দুঃখ তাহাকে নিজের সীমাবদ্ধতার পরিচয় দেয়। কিন্তু কিছু শিক্ষা আছে, যাহার বীজ বপন হয় শৈশবেই। পরবর্তী জীবনের সমস্ত অভিজ্ঞতা সেই বীজকে জল দেয়, আলো দেয়, কখনো ঝড়ের মুখে দাঁড় করায়; কিন্তু শিকড়ের প্রথম স্পর্শটি শৈশবের মাটিতেই রহিয়া যায়।
আমি যখন কোনো দরিদ্র শিশুকে বইয়ের অভাবে পড়াশোনা করিতে না দেখিয়া তাহার জন্য একটি বই সংগ্রহ করিবার চেষ্টা করি, তখন পিতার কথা মনে পড়ে। যখন কোনো ক্লান্ত মানুষকে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করি, তখন মায়ের মুখ মনে পড়ে। যখন কোনো বন্ধু বিপদে পড়িয়া নীরবে আমার পাশে বসিয়া থাকে, তখন নীলয়ের কথা মনে পড়ে। আর যখন জীবনের কঠিন সময়ে আশা হারাইতে বসি, তখন দাদির বলা কুসুমের গল্প মনে পড়ে—ঝড়ে ভাঙিয়া যাওয়া শিউলিগাছটির কথা।
আমার শৈশব আমাকে শিখাইয়াছে, মানুষের বড়ত্ব তাহার সম্পদে নহে, তাহার হৃদয়ের প্রশস্ততায়। একটি ছোট ঘরও বৃহৎ হইয়া উঠিতে পারে, যদি সেখানে ভালোবাসা থাকে। একটি সামান্য উপহারও অমূল্য হইয়া উঠিতে পারে, যদি তাহার সঙ্গে আন্তরিকতা যুক্ত থাকে। একটি ক্ষুদ্র বন্ধুত্বও সারাজীবনের সম্পদ হইতে পারে, যদি তাহাতে স্বার্থের পরিবর্তে বিশ্বাস থাকে। আর একটি সাধারণ গ্রামও সমগ্র পৃথিবীর সমান হইয়া উঠিতে পারে, যদি সেখানে মানুষের প্রথম আনন্দ ও প্রথম ভালোবাসার স্মৃতি জমা থাকে।
আমরা প্রায়ই বলি, শৈশব ছিল জীবনের সোনালী সময়। কিন্তু কেন সোনালী? কেবল এই কারণে নহে যে, তখন আমাদের দায়িত্ব কম ছিল কিংবা দুশ্চিন্তা ছিল না। শৈশব সোনালী, কারণ তখন আমরা ছোট বিষয়েও আনন্দ খুঁজিয়া পাইতাম। একটি প্রজাপতির উড়াল, বৃষ্টির জলে পা ডুবানো, নতুন খাতার গন্ধ, মায়ের হাতে গরম ভাত, বন্ধুর সঙ্গে ভাগ করিয়া খাওয়া একটি আম—এই সামান্য ঘটনাগুলিই আমাদের দিনকে পূর্ণ করিয়া তুলিত।
বয়স বাড়িবার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের আনন্দের শর্তও বাড়িতে থাকে। আমরা ভাবি, বড় বাড়ি হইলে সুখী হইব, অধিক অর্থ থাকিলে নিশ্চিন্ত হইব, উচ্চ পদ পাইলে সম্মান লাভ করিব। কিছু অর্জন অবশ্যই প্রয়োজন; মানুষের দায়িত্ব আছে, পরিবারের প্রয়োজন আছে, জীবনের নিরাপত্তা আছে। কিন্তু সেই প্রয়োজনের পেছনে ছুটিতে ছুটিতে আমরা যদি ছোট আনন্দগুলিকে অবহেলা করি, তবে একসময় দেখিব, জীবন অনেক দূর এগাইয়াছে, অথচ হৃদয় কোথাও পিছনে পড়িয়া রহিয়াছে।
শৈশবের কাছে আমার ঋণ অনেক। সে আমাকে পৃথিবীকে বিস্ময়ের চোখে দেখিতে শিখাইয়াছে। সে আমাকে শিখাইয়াছে, ভুল করিয়া আবার চেষ্টা করা যায়; বন্ধুর সঙ্গে অভিমান করিয়া আবার মিলিত হওয়া যায়; দুঃখের মধ্যেও আনন্দের ক্ষুদ্র দ্বার খোলা থাকে। সে আমাকে আরও শিখাইয়াছে, কোনো সম্পর্কের মূল্য বুঝিবার জন্য তাহাকে হারানো পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত নহে। যাহারা আজ আমাদের পাশে আছেন, তাঁহাদের ভালোবাসা আজই অনুভব করা প্রয়োজন।
আমি যখন মায়ের মুখের দিকে চাহি, তখন সময়ের পরিবর্তন স্পষ্ট দেখিতে পাই। যে হাত একদিন আমার জন্য রাত্রি জাগিয়া থাকিত, সেই হাত এখন সামান্য কাজ করিলেই ক্লান্ত হইয়া পড়ে। যে পিতা একদিন দীর্ঘ পথ হাঁটিয়া বিদ্যালয়ে যাইতেন, তিনি এখন অল্প দূর চলিয়াই বিশ্রাম গ্রহণ করেন। এই পরিবর্তন আমাকে মনে করাইয়া দেয়, আমাদের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় অনেক সময় আমাদের অজান্তেই অতিবাহিত হইয়া যায়। আমরা ভাবি, পরে সময় পাইলে মায়ের পাশে বসিব, পরে সময় পাইলে পিতার গল্প শুনিব, পরে সময় পাইলে গ্রামের পথে হাঁটিব। কিন্তু সেই ‘পরে’ যে সব সময় আসিবে, তাহার নিশ্চয়তা কোথায়?
তাই এখন চেষ্টা করি, বাড়ি ফিরিলে মায়ের পাশে বসিয়া গল্প করিতে, পিতার পুরাতন দিনের কথা শুনিতে, সন্ধ্যায় উঠানে কিছুক্ষণ কাটাইতে। তাঁহাদের কথা কখনো একই বিষয়কে কেন্দ্র করিয়া ঘুরিতে থাকে, কখনো পুরাতন স্মৃতি বারবার ফিরে আসে। আগে হয়তো এই পুনরাবৃত্তিতে বিরক্ত হইতাম; এখন মনোযোগ দিয়া শুনি। কারণ, একদিন এই কণ্ঠস্বরগুলি আর শুনিতে পাইব না। তখন হয়তো একটি সাধারণ বাক্য, একটি পরিচিত দীর্ঘশ্বাস কিংবা রান্নাঘরের একটি শব্দের জন্যও হৃদয় ব্যাকুল হইয়া উঠিবে।
মানুষের জীবনে সময়ের সবচেয়ে নির্মম সত্য এই যে, সে কোনো কিছুকেই চিরকাল একই অবস্থায় রাখে না। শৈশব শেষ হয়, যৌবন ফুরায়, প্রিয়জন বৃদ্ধ হন, গাছের ডাল শুকাইয়া যায়, নদীর পথ বদলাইয়া যায়। কিন্তু পরিবর্তন মানেই সবকিছুর বিনাশ নহে। পরিবর্তনের ভিতর দিয়াই স্মৃতি বাঁচিয়া থাকে, ভালোবাসা নতুন রূপ লাভ করে, অভিজ্ঞতা মানুষের চরিত্র নির্মাণ করে।
শৈশবের সোনালী দিনগুলি আর ফিরিয়া আসিবে না—এই সত্য মেনে লইয়াছি। কিন্তু তাহার অর্থ এই নহে যে, সেই দিনগুলির আনন্দ সম্পূর্ণ হারাইয়া গিয়াছে। আমার কথাবার্তায়, আমার সিদ্ধান্তে, অন্যের প্রতি আমার আচরণে, কোনো শিশুর হাসি দেখিয়া আমার হৃদয়ে যে আনন্দ জাগে—সেই সমস্ত কিছুর মধ্যে আমার শৈশবের একটি অংশ আজও বাঁচিয়া আছে। আমি যখন নিজের সন্তান কিংবা কোনো ছোট শিশুকে মুক্ত মনে খেলিতে দেখি, তখন তাহাদের আনন্দের মধ্যে নিজের হারানো দিনগুলির প্রতিচ্ছবি খুঁজিয়া পাই।
হয়তো এইভাবেই মানুষ সময়কে অতিক্রম করে। সে নিজের শৈশব ফিরাইয়া পায় না, কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মের শৈশবকে সুন্দর করিবার চেষ্টা করিতে পারে। সে নিজের হারানো আনন্দ ফিরাইয়া আনিতে পারে না, কিন্তু অন্যের জীবনে আনন্দের কারণ হইতে পারে। সে মৃত প্রিয়জনকে ফিরাইয়া আনিতে পারে না, কিন্তু তাঁহাদের শিক্ষা ও ভালোবাসাকে নিজের জীবনে ধারণ করিতে পারে। এইখানেই স্মৃতির প্রকৃত সার্থকতা।
১৫. সোনালী অতীতের শেষ আলো
আজ রাত্রে আবার জানালার পাশে বসিয়া আছি। বাইরে নগরের আলো জ্বলিতেছে। দূরের আকাশে মেঘ জমিয়াছে, হয়তো কিছুক্ষণ পরে বৃষ্টি নামিবে। বৃষ্টির সম্ভাবনা দেখিয়া অকারণেই আমার সেই পুরাতন উঠানের কথা মনে পড়িল। মনে পড়িল, কীভাবে আমরা খাতার পাতা ছিঁড়িয়া নৌকা বানাইতাম, কীভাবে নীলয় আনন্দে চিৎকার করিত, কীভাবে মাতা ভেজা জামাকাপড় পরিবর্তন করিতে বলিতেন, আর পিতা দূর হইতে আমাদের কাণ্ডকারখানা দেখিয়া হাসিতেন।
কত সামান্য ছিল আমাদের প্রয়োজন! একটি কাগজ, একটু জল, কয়েকজন বন্ধু এবং কল্পনার অসীম আকাশ—এই দিয়াই আমরা সম্পূর্ণ এক পৃথিবী নির্মাণ করিতে পারিতাম। আজ আমাদের হাতে কত আধুনিক যন্ত্র, কত যোগাযোগের ব্যবস্থা, কত বিনোদনের আয়োজন; তবু সেই সরল আনন্দের পুনরাবৃত্তি সহজে ঘটে না। কারণ, আনন্দের উপকরণ বাড়িলেই আনন্দের গভীরতা বাড়ে না। কখনো কখনো অল্পের মধ্যে যে পরিপূর্ণতা থাকে, প্রাচুর্যের মধ্যে তাহা খুঁজিয়া পাওয়া কঠিন।
আমি জানি না, নীলয় এখন কোথায় আছে। হয়তো সে কোনো ব্যস্ত নগরে সংসার গড়িয়াছে, হয়তো কোনো ছোট শহরে কাজ করে, হয়তো তাহারও সন্তান আছে, যাহাদের সে নিজের শৈশবের গল্প শুনায়। কখনো কি তাহার মনে পড়ে, একটি গ্রামে তাহার এক বন্ধু ছিল, যে তাহার সঙ্গে আমবাগানে দৌড়াইয়াছিল, বর্ষার জলে কাগজের নৌকা ভাসাইয়াছিল এবং বিদায়ের দিন পথের ধারে দাঁড়াইয়া কাঁদিয়াছিল? আমি জানি না। কিন্তু তাহার স্মৃতি আমার কাছে কোনো অসমাপ্ত হিসাব নহে; তাহা আমার জীবনের এক মূল্যবান অধ্যায়।
আমি জানি না, আমাদের গ্রামের সেই পুরাতন বিদ্যালয় আর কত দিন টিকিয়া থাকিবে। হয়তো একদিন তাহার জায়গায় নতুন ভবন উঠিবে, পুরাতন নিমগাছটি কাটা পড়িবে, শ্রেণিকক্ষের বেঞ্চগুলি বদলাইয়া যাইবে। হয়তো মধুমতী নদী আরও দূরে সরিয়া যাইবে, বটবৃক্ষের অবশিষ্ট ডালগুলিও একদিন ভাঙিয়া পড়িবে। কিন্তু আমার স্মৃতিতে বিদ্যালয়টি সেই পুরাতন রূপেই থাকিবে, নদীটি সেই পরিচিত স্রোতেই বহিবে, আর বটবৃক্ষের নিচে নীলয় ও আমি চিরকাল পাশাপাশি বসিয়া থাকিব।
স্মৃতি বাস্তবকে অপরিবর্তিত রাখিতে পারে না, কিন্তু বাস্তবের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ককে অমলিন রাখিতে পারে। যে মানুষ চলিয়া গিয়াছেন, তাঁহাকে ফিরাইয়া আনিতে পারে না; কিন্তু তাঁহার প্রতি ভালোবাসাকে হৃদয়ে জাগাইয়া রাখিতে পারে। যে দিন হারাইয়া গিয়াছে, তাহাকে ফিরাইয়া আনিতে পারে না; কিন্তু সেই দিনের আলোয় বর্তমানকে দেখিবার সুযোগ দেয়। এইজন্য স্মৃতি কেবল অতীতের সংরক্ষণ নহে, তাহা বর্তমান জীবনেরও এক গভীর আশ্রয়।
আমার মনে হয়, মানুষের অন্তরে একটি গোপন বাড়ি থাকা প্রয়োজন। সেই বাড়ির দরজা বাহিরের কোলাহলে সহজে খুলে না; সেখানে প্রবেশ করিতে হয় নীরবে, একাকী। সেই বাড়ির উঠানে মাটির গন্ধ আছে, জানালার পাশে শিউলিগাছ আছে, ঘরের কোণে পিতার কাঠের বাক্স আছে, রান্নাঘরে মায়ের চুলা জ্বলিতেছে, আর উঠানের এক পাশে নীলয় অপেক্ষা করিতেছে। দাদির ঘরে কুপিবাতি জ্বলিতেছে, দূরে নদীর জল চিকচিক করিতেছে। এই বাড়িতে কোনো ঘড়ি নাই, কোনো তাড়া নাই, কোনো প্রতিযোগিতা নাই। সেখানে কেবল সময়ের প্রথম সকালটি চিরকাল স্থির হইয়া আছে।
আমি যখন ক্লান্ত হই, সেই বাড়িতে ফিরিয়া যাই। যখন ব্যর্থতা আমাকে নিরাশ করে, পিতার কণ্ঠস্বর স্মরণ করি। যখন পৃথিবী কঠিন মনে হয়, মায়ের আঁচলের উষ্ণতা মনে পড়ে। যখন একাকিত্ব ঘিরিয়া ধরে, নীলয়ের বন্ধুত্বের কথা ভাবি। আর যখন বুঝিতে পারি না, আগামী দিনের পথে কীভাবে চলিব, তখন দাদির সেই কথাটি স্মরণ করি—মানুষ যত দূরেই যাক, নিজের শিকড় ভুলিয়া গেলে চলিবে না।
সোনালী অতীতের প্রতি আমার ভালোবাসা তাই কেবল হারানো দিনের জন্য দীর্ঘশ্বাস নহে। ইহা আমার অস্তিত্বের প্রতি কৃতজ্ঞতা। যে মানুষগুলি আমাকে ভালোবাসিয়াছেন, যে মাটি আমাকে আশ্রয় দিয়াছে, যে নদী আমাকে স্বপ্ন দেখাইয়াছে, যে বিদ্যালয় আমাকে জ্ঞানের পথে প্রথম আহ্বান জানিয়াছে—তাঁহাদের সকলের কাছে আমার ঋণ রহিয়াছে। সেই ঋণ কোনো সম্পদ দিয়া শোধ করা যায় না; কেবল ভালো মানুষ হইবার চেষ্টা দিয়া তাহার প্রতি সম্মান জানানো যায়।
রাত্রি আরও গভীর হইল। জানালার বাহিরে বৃষ্টি নামিয়াছে। বৃষ্টির ফোঁটা কাচের উপর পড়িয়া ছোট ছোট রেখা তৈরি করিতেছে। আমি চোখ বন্ধ করিলাম। মুহূর্তের জন্য মনে হইল, আমি আবার সেই গ্রামের ছোট্ট ঘরে ফিরিয়া গিয়াছি। মাতা রান্নাঘরে, পিতা বই পড়িতেছেন, দাদি গল্পের প্রস্তুতি লইতেছেন, আর নীলয় দরজার বাহিরে দাঁড়াইয়া ডাকিতেছে—“চল, নদীর ধারে যাই।”
আমি যেন আবার সেই শিশুটি হইয়া উঠিলাম। কোনো দুশ্চিন্তা নাই, কোনো হিসাব নাই, কোনো বিচ্ছেদের ভয় নাই। কেবল বৃষ্টির শব্দ, মাটির গন্ধ, বন্ধুর ডাক এবং অসীম এক আনন্দ। আমি মনে মনে বলিলাম, “আর একটু থাকিতে দাও। এইবার আর তাড়াতাড়ি বড় হইব না।” কিন্তু স্মৃতিরও নিজস্ব নিয়ম আছে। সে কিছুক্ষণ আলো দেখায়, তারপর ধীরে ধীরে পর্দা নামাইয়া দেয়।
চোখ খুলিয়া দেখি, আমি এখনও নগরের সেই ঘরেই বসিয়া আছি। বৃষ্টি পড়িতেছে, রাত গভীর হইয়াছে, আগামীকাল আবার কাজ আছে। জীবন তাহার নিজস্ব পথে চলিয়া যাইবে। আমাকে উঠিতে হইবে, আলো নিভাইতে হইবে, আগামী দিনের প্রস্তুতি লইতে হইবে। তবু আমার হৃদয়ের গভীরে আজ একটি শান্তি জন্মিয়াছে। কারণ, বুঝিতে পারিয়াছি, শৈশবকে হারানো যায় না সম্পূর্ণভাবে। তাহা সময়ের কাছে দৃশ্যত পরাজিত হইলেও স্মৃতির মধ্যে এক অমর আশ্রয় নির্মাণ করিয়া রাখে।
যে দিনগুলিকে একসময় সাধারণ বলিয়া মনে হইত, আজ তাহারাই জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। যে মুখগুলিকে প্রতিদিন দেখিয়া কখনো গুরুত্ব দিই নাই, আজ তাহাদের স্মৃতিই হৃদয়ের গভীরতম স্থানে আলো জ্বালায়। যে পথে প্রতিদিন হাঁটিতাম, আজ সেই পথের জন্য মন ব্যাকুল হয়। যে নদীকে প্রতিদিন দেখিতাম, আজ তাহার জল কল্পনায়ও শান্তি দেয়। এইভাবেই সময় আমাদের শেখায়, কোনো মুহূর্তই সম্পূর্ণ সাধারণ নহে; তাহার মূল্য আমরা অনেক সময় বুঝিতে পারি কেবল সেই মুহূর্ত অতীত হইয়া যাওয়ার পরে।
তাই আজ আমি আমার শৈশবকে বিদায় জানাই না। বরং তাহাকে হৃদয়ের ভিতরে সযত্নে রাখিয়া দিই। আমি জানি, আর কোনো দিন সেই বয়সে ফিরিতে পারিব না, সেইভাবে দৌড়াইতে পারিব না, সেই নির্ভার আনন্দে দিন কাটাইতে পারিব না। কিন্তু যত দিন আমার স্মৃতি আছে, যত দিন আমার হৃদয়ে ভালোবাসা আছে, তত দিন আমার শৈশবও আমার সঙ্গে থাকিবে।
সময়ের স্রোত আমাদের সকলকে দূরে লইয়া যায়। নদীর জল ফিরিয়া আসে না, ঝরা পাতা পুরাতন ডালে যুক্ত হয় না, অতিবাহিত দিন পুনরায় ক্যালেন্ডারে ফিরে আসে না। তথাপি মানুষের হৃদয় এমন এক আশ্চর্য স্থান, যেখানে হারানো মানুষও ফিরে আসেন, নিভিয়া যাওয়া প্রদীপও আবার জ্বলে, আর বহু দূরের শৈশবও এক মুহূর্তের জন্য বর্তমান হইয়া ওঠে।
আমার জীবনের সেই সোনালী অতীত আজ আর কোনো গ্রামের নামমাত্র নহে। তাহা আমার মায়ের স্নেহ, পিতার ত্যাগ, দাদির গল্প, নীলয়ের বন্ধুত্ব, বিদ্যালয়ের ঘণ্টা, বর্ষার কাগজের নৌকা এবং নদীর ওপারে হারাইয়া যাওয়া সূর্যের সমষ্টি। তাহা আমার জীবনের প্রথম কবিতা, প্রথম বেদনা, প্রথম ভালোবাসা এবং প্রথম স্বপ্নের নাম।
যদি কোনো দিন জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়াইয়া পিছনে ফিরিয়া চাহিতে হয়, তবে হয়তো বড় বড় অর্জনের কথা আমার প্রথমে মনে পড়িবে না। মনে পড়িবে একটি মাটির বাড়ি, সন্ধ্যার কুপিবাতি, মায়ের মুখ, পিতার হাত, দাদির গল্প এবং এক বন্ধুর সঙ্গে নদীতে ভাসানো কাগজের নৌকা। মনে পড়িবে, একদিন আমি ছোট ছিলাম, পৃথিবী ছিল বিশাল, আর আনন্দ ছিল হাতের নাগালে।
সেই স্মৃতির কাছেই আমার শেষ প্রার্থনা—যত দিন বাঁচি, যেন হৃদয়ের কোমলতা হারাইয়া না ফেলি। যেন অন্যের দুঃখ দেখিয়া মুখ ফিরাইয়া না লই, যেন প্রিয়জনের ভালোবাসাকে অবহেলা না করি, যেন ক্ষুদ্র আনন্দের মধ্যে বৃহৎ সুখ খুঁজিয়া পাই। আর যেন জীবনের সমস্ত পরিবর্তনের মধ্যেও নিজের শিকড়ের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকিতে পারি।
কারণ, শৈশব কেবল জীবনের একটি অতীত অধ্যায় নহে; শৈশব আমাদের অন্তরের সেই চিরসবুজ প্রাঙ্গণ, যেখানে মানুষ বারবার ফিরিয়া আসিতে পারে। সেখানে সময়ের ক্ষয় নাই, বিচ্ছেদের চূড়ান্ততা নাই, ভালোবাসার অবসান নাই। সেখানে প্রতিটি ভোর নতুন, প্রতিটি বৃষ্টি আনন্দময়, প্রতিটি বন্ধুত্ব অমলিন, আর প্রতিটি স্বপ্নের সামনে অসীম আকাশ উন্মুক্ত।
এই পৃথিবীতে অনেক কিছু হারাইয়া যায়। হারাইয়া যায় বাড়ি, পথ, নদীর পুরাতন বাঁক, পরিচিত মুখ এবং একসঙ্গে কাটানো অসংখ্য দিন। কিন্তু যে ভালোবাসা আমাদের মানুষ করিয়া তোলে, যে স্মৃতি আমাদের হৃদয়কে কোমল রাখে, যে শৈশব আমাদের প্রথম পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করাইয়া দেয়—তাহা কখনো সম্পূর্ণ হারায় না। তাহা নিঃশব্দে আমাদের ভিতরে বাঁচিয়া থাকে, জীবনের প্রতিটি বাঁকে আমাদের হাত ধরিয়া রাখে।
আর সেই কারণেই আজও, বহু দূরের নগরে বসিয়া, রাত্রির বৃষ্টির শব্দ শুনিতে শুনিতে আমার মনে হয়—আমার সেই ছোট্ট গ্রামটি এখনও কোথাও আছে; নদীটি এখনও বহিতেছে, বটবৃক্ষটি এখনও ছায়া দিতেছে, আর এক কিশোর এখনও বন্ধুর অপেক্ষায় দাঁড়াইয়া আছে। তাহার হাতে একটি কাগজের নৌকা, চোখে অগণিত স্বপ্ন, আর হৃদয়ে পৃথিবীর প্রতি অপরিসীম বিশ্বাস।
আমি জানি, সেই কিশোর আর বাস্তবে ফিরিয়া আসিবে না। তবু তাহাকে আমি হারাইতে দিই নাই। সে আমার ভিতরেই আছে, আমার প্রতিটি স্মৃতির মধ্যে, প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসে, প্রতিটি নির্মল আনন্দে। জীবন যত দূরেই আমাকে লইয়া যাক, আমি তাহার হাত ছাড়িব না। কারণ, সেই কিশোরই আমাকে শিখাইয়াছে কীভাবে পৃথিবীকে ভালোবাসিতে হয়, কীভাবে স্বপ্ন দেখিতে হয়, কীভাবে হারানোর পরেও স্মৃতিকে বাঁচাইয়া রাখিতে হয়।
শৈশবের দিনগুলি ফিরিয়া আসে না, কিন্তু তাহাদের সোনালী আলো কখনো নিভিয়া যায় না।
সেই হারাইয়া যাওয়া দিনগুলির স্মৃতির প্রতি রইল আমার অন্তহীন ভালোবাসা।
পোস্ট পড়ে পয়েন্ট পেতে লগইন করুন।
লগইন করুন