জমি, বাড়ি বা অন্য কোনো স্থাবর সম্পত্তির দলিল রেজিস্ট্রেশনের আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি হলো প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিকঠাক প্রস্তুত রাখা। একটি কাগজ বাদ পড়লে বা পুরোনো তথ্যের সঙ্গে বর্তমান তথ্যের মিল না থাকলে পরে ঝামেলা তৈরি হতে পারে। তাই ২০২৬ সালে দলিল রেজিস্ট্রেশনের জন্য সাধারণভাবে যেসব কাগজপত্র প্রয়োজন হতে পারে, সেগুলো আগে থেকেই জেনে রাখা ভালো।
দলিল রেজিস্ট্রেশনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
সরকারি সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী জমির দলিলের ক্ষেত্রে খতিয়ান, ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা, পরিচয়পত্র, ছবি, বায়া দলিল এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ওয়ারিশ সনদসহ বিভিন্ন কাগজপত্র লাগতে পারে। তবে দলিলের ধরন ও সম্পত্তির মালিকানা কীভাবে এসেছে তার ওপর প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের কিছুটা পার্থক্য হতে পারে।
১. সর্বশেষ খতিয়ান
সংশ্লিষ্ট জমির সর্বশেষ প্রযোজ্য খতিয়ানের মূল কপি অথবা সার্টিফায়েড কপি প্রয়োজন হতে পারে। এর মধ্যে সিএস, এসএ, আরএস, বিএস/বিআরএস বা নামজারি খতিয়ান প্রযোজ্য হতে পারে। বর্তমান আইনের ৫২ক ধারায় বিক্রয় দলিলের ক্ষেত্রে সম্পত্তির সর্বশেষ খতিয়ানের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ রয়েছে।
২. ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা
জমির হাল সন পর্যন্ত ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা পরিশোধের দাখিলা গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রের মধ্যে পড়ে। তাই পুরোনো রশিদের পাশাপাশি সর্বশেষ পরিশোধের দাখিলা সংরক্ষণ করে রাখা ভালো। সরকারি ভূমি উন্নয়ন কর সিস্টেমেও জমির তথ্যের সঙ্গে দাখিলা ও খারিজ খতিয়ানের তথ্য ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
৩. জাতীয় পরিচয়পত্র বা পরিচয়পত্রের কপি
ক্রেতা ও বিক্রেতার জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি সাধারণত প্রয়োজন হয়। জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকলে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে জন্ম নিবন্ধন সনদ বা পাসপোর্টের কপি ব্যবহার করা যেতে পারে। সরকারি সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের প্রকাশিত তালিকাতেও এসব পরিচয়পত্রের কথা উল্লেখ আছে।
৪. ক্রেতা ও বিক্রেতার ছবি
ক্রেতা ও বিক্রেতার সদ্যতোলা পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি প্রয়োজন হতে পারে। এছাড়া Registration Act-এর ২২ক ধারায় হস্তান্তর দলিলে পক্ষগুলোর ছবি সংযুক্ত করার বিধান রয়েছে।
আরো পড়ুন:
৫. বায়া দলিল
জমির বর্তমান মালিক কীভাবে সম্পত্তিটির মালিক হয়েছেন, তার ধারাবাহিকতা বোঝার জন্য প্রয়োজনীয় বায়া দলিল গুরুত্বপূর্ণ। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে এসব দলিলের মূল কপি অথবা সার্টিফায়েড কপি প্রয়োজন হতে পারে। সরকারি নির্দেশনায় বায়া দলিল সংগ্রহ ও যাচাইয়ের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।
৬. ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকার সনদ
সম্পত্তিটি যদি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া হয়ে থাকে, তাহলে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকার সনদ প্রয়োজন হতে পারে। সরকারি সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের তালিকায় উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে এই সনদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
৭. জমির মৌজা ম্যাপ বা প্রয়োজনীয় নকশা
জমির অবস্থান ও সীমানা স্পষ্ট করার জন্য প্রয়োজনীয় মৌজা ম্যাপ বা নকশা লাগতে পারে। Registration Act-এর ৫২ক ধারাতেও সম্পত্তির মানচিত্র, অক্ষ ও সীমানার তথ্যের কথা রয়েছে।
৮. ই-টিআইএন সংক্রান্ত কাগজ
কিছু নির্দিষ্ট সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে ক্রেতা ও বিক্রেতার ই-টিআইএন বা করসংক্রান্ত প্রমাণপত্র প্রয়োজন হতে পারে। এ বিষয়ে সম্পত্তির মূল্য, অবস্থান ও প্রযোজ্য কর বিধান বিবেচনা করা জরুরি। পুরোনো সরকারি অফিসের তালিকাতেও নির্দিষ্ট এলাকার নির্দিষ্ট মূল্যের সম্পত্তির ক্ষেত্রে ই-টিআইএনের উল্লেখ রয়েছে।
আরও যেসব কাগজপত্র প্রযোজ্য হতে পারে
সম্পত্তির মালিকানা যদি উত্তরাধিকার, দান, হেবা, আদালতের আদেশ, পূর্বের হস্তান্তর বা অন্য কোনো বিশেষ সূত্রে হয়ে থাকে, তাহলে সেই মালিকানার প্রমাণ হিসেবে অতিরিক্ত দলিল প্রয়োজন হতে পারে। তাই শুধু সাধারণ তালিকা দেখে সব জমির জন্য একই কাগজপত্র ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কাগজপত্রে জমির মালিকের নাম, খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ ও অন্যান্য তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা। কারণ স্থাবর সম্পত্তির দলিলে সম্পত্তিকে শনাক্ত করার মতো পর্যাপ্ত বিবরণ থাকা আইনের দৃষ্টিতেও গুরুত্বপূর্ণ।
কাগজপত্র নেওয়ার আগে একটি ছোট চেকলিস্ট
- সর্বশেষ প্রযোজ্য খতিয়ান
- হালনাগাদ ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা
- ক্রেতা ও বিক্রেতার পরিচয়পত্রের কপি
- সদ্যতোলা রঙিন ছবি
- প্রয়োজনীয় বায়া দলিল
- প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ওয়ারিশ সনদ
- প্রয়োজনীয় মৌজা ম্যাপ বা নকশা
- প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ই-টিআইএন ও করসংক্রান্ত কাগজপত্র
- মালিকানার বিশেষ সূত্র থাকলে তার প্রমাণপত্র
২০২৬ সালে দলিল রেজিস্ট্রেশনের কাগজপত্রের ক্ষেত্রে সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি হলো আপনার জমির ধরন ও মালিকানার অবস্থা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নথি মিলিয়ে নেওয়া। কারণ সব ধরনের দলিলের জন্য একই কাগজপত্র প্রযোজ্য নয়। সরকারি সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের তথ্য এবং প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নথির তালিকা যাচাই করে তারপর কাগজপত্র প্রস্তুত করলে অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তি কমানো সম্ভব।