বাবা, দাদা বা পরিবারের পুরোনো জমিজমার হিসাব খুঁজতে গিয়ে অনেকেই প্রথমে দলিলের ফাইল খোঁজেন। কিন্তু সব তথ্য শুধু দলিলে থাকে না। জমির খতিয়ান, দাগ নম্বর, মৌজা এবং নামজারির তথ্য থেকেও জমির রেকর্ড সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
এখন ভূমি সংক্রান্ত বেশ কিছু সেবা অনলাইনে পাওয়া যায়। ফলে মোবাইল ফোন ব্যবহার করেই নির্দিষ্ট এলাকার জমির রেকর্ড ও খতিয়ান সংক্রান্ত তথ্য খোঁজা সম্ভব। ভূমি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, অনলাইনে ভূমির মালিকানা বা স্বত্বের ইতিবৃত্ত এবং দাগের ইতিবৃত্ত জানার সুবিধা রয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ: অনলাইনে পাওয়া খতিয়ান বা রেকর্ডের তথ্যকে জমির চূড়ান্ত মালিকানার একমাত্র প্রমাণ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। জমি কেনাবেচা বা উত্তরাধিকার সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের আগে মূল দলিল ও সংশ্লিষ্ট ভূমি রেকর্ড যাচাই করা উচিত।
মোবাইল দিয়ে জমির তথ্য দেখতে কী কী জানা দরকার?
আপনি যদি বাবা বা দাদার নামে কোনো জমির রেকর্ড খুঁজতে চান, তাহলে শুধু নাম জানলেই সবসময় কাজ হবে না। জমিটি কোন জেলা, উপজেলা, মৌজা এবং কোন দাগ বা খতিয়ানের অধীনে রয়েছে—এসব তথ্য জানা থাকলে অনুসন্ধান অনেক সহজ হয়।
পুরোনো দলিল, খাজনার রসিদ, খতিয়ান বা পরিবারের কাছে থাকা জমির কাগজপত্র থেকে এসব তথ্য পাওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে খতিয়ান নম্বর ও দাগ নম্বর জানা থাকলে নির্দিষ্ট জমি শনাক্ত করা তুলনামূলকভাবে সহজ হয়।
ধাপে ধাপে মোবাইল দিয়ে জমির তথ্য খোঁজার নিয়ম
১. ভূমি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন
প্রথমে মোবাইলের Chrome বা অন্য কোনো ব্রাউজার খুলে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সরকারি ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন। ভূমি সংক্রান্ত বিভিন্ন অনলাইন সেবার জন্য সরকারি পোর্টালটি ব্যবহার করা যায়।
→ ভূমি মন্ত্রণালয়ের সরকারি ওয়েবসাইট খুলুন
২. প্রয়োজনীয় ভূমি সেবা নির্বাচন করুন
ভূমি সেবা পোর্টালে গিয়ে আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী খতিয়ান, ভূমি রেকর্ড বা সংশ্লিষ্ট সেবাটি নির্বাচন করতে হবে। কোন রেকর্ড অনলাইনে পাওয়া যাবে, সেটি এলাকার জরিপ ও ডিজিটাল রেকর্ডের অবস্থার ওপর নির্ভর করতে পারে।
তাই কোনো একটি জায়গায় তথ্য না পাওয়া মানেই ওই ব্যক্তির নামে জমি নেই—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। পুরোনো বা এখনও ডিজিটাল সেবার আওতায় না আসা রেকর্ডের ক্ষেত্রে স্থানীয় ভূমি অফিসে খোঁজ নিতে হতে পারে।
৩. জেলা, উপজেলা ও মৌজার তথ্য দিন
জমির অবস্থান জানা থাকলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট জেলা ও উপজেলা নির্বাচন করুন। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী মৌজা এবং অন্যান্য রেকর্ডের তথ্য দিতে হবে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সঠিক মৌজা নির্বাচন করা। একই বা কাছাকাছি নামের একাধিক মৌজা থাকতে পারে। তাই পুরোনো দলিল বা খতিয়ানের তথ্য দেখে নির্বাচন করাই ভালো।
৪. খতিয়ান বা দাগের তথ্য দিয়ে অনুসন্ধান করুন
আপনার কাছে খতিয়ান নম্বর বা দাগ নম্বর থাকলে সেটি ব্যবহার করে নির্দিষ্ট জমির রেকর্ড খুঁজে দেখা সহজ হয়। রেকর্ডে মালিকের নাম, দাগ এবং জমির পরিমাণের মতো তথ্য থাকতে পারে। সরকারি ডিজিটাল খতিয়ানের নমুনাতেও মালিকের নাম, অংশ, দাগ নম্বর এবং জমির পরিমাণের মতো তথ্যের ঘর রয়েছে।
৫. রেকর্ডের তথ্য মিলিয়ে দেখুন
তথ্য পাওয়ার পর শুধু নাম দেখেই নিশ্চিত হবেন না। মালিকের নামের পাশাপাশি পিতা বা স্বামীর নাম, মৌজা, খতিয়ান, দাগ এবং জমির পরিমাণ মিলিয়ে দেখুন। একই নামে একাধিক ব্যক্তি থাকতে পারেন।
বিশেষ করে বাবা বা দাদার পুরোনো নামের বানান এবং বর্তমান কাগজপত্রের নামের মধ্যে পার্থক্য থাকলে বিষয়টি আরও ভালোভাবে যাচাই করা দরকার।
আরো পড়ুনঃ
জমির পরিমাণ কোথায় দেখা যায়?
ডিজিটাল খতিয়ানে জমির পরিমাণ বিভিন্ন এককে উল্লেখ থাকতে পারে। সরকারি খতিয়ানের নমুনায় হেক্টর, একর ও শতাংশসহ জমির পরিমাণ দেখানোর ব্যবস্থা রয়েছে।
তাই রেকর্ডে যদি একরের পরিবর্তে শতাংশ বা অন্য এককে পরিমাণ দেওয়া থাকে, সেটিকে নিজের মতো করে অনুমান না করে রেকর্ডে উল্লেখ করা পরিমাণটি আগে ঠিকভাবে বুঝে নিন।
ভূমি উন্নয়ন করের তথ্য থেকেও কিছু ধারণা পাওয়া যায়
আপনার পরিবারের জমি যদি ভূমি উন্নয়ন কর ব্যবস্থায় নিবন্ধিত থাকে, তাহলে অনলাইন ভূমি উন্নয়ন কর সেবাতেও সংশ্লিষ্ট খতিয়ান ও হোল্ডিংয়ের তথ্য পাওয়া যেতে পারে। সরকারি সিস্টেমে নাগরিক নিবন্ধনের জন্য মোবাইল নম্বর, NID নম্বর, জন্মতারিখ এবং খতিয়ান বা দাখিলা/খারিজ খতিয়ানের তথ্য প্রয়োজন হতে পারে।
ভূমি উন্নয়ন করের সরকারি সেবা:
মৌজা ম্যাপ বা দাগের অবস্থান দেখতে চাইলে
শুধু জমির পরিমাণ জানলেই অনেক সময় কাজ শেষ হয় না। জমিটি মৌজার কোথায় আছে বা নির্দিষ্ট দাগটি কোন জায়গায় পড়েছে, সেটিও জানা দরকার হতে পারে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থায় দাগভিত্তিক তথ্য ও মৌজা ম্যাপ সংক্রান্ত সেবার ব্যবস্থা রয়েছে।
অনলাইনে তথ্য না পেলে কী করবেন?
অনলাইনে খুঁজে কোনো তথ্য না পেলে সরাসরি ধরে নেওয়া যাবে না যে বাবা বা দাদার নামে জমি নেই। পুরোনো রেকর্ড, জরিপের ধরন, এলাকার ডিজিটাল রেকর্ডের অবস্থা কিংবা তথ্যের বানানের পার্থক্যের কারণে অনুসন্ধানে ফল নাও আসতে পারে।
এমন হলে পুরোনো দলিল, খতিয়ান, দাখিলা বা অন্যান্য কাগজপত্র নিয়ে সংশ্লিষ্ট উপজেলা ভূমি অফিস বা ভূমি অফিসে যোগাযোগ করা যেতে পারে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ভূমি নিবন্ধন, নামজারি, জমাভাগ, জমা একত্রীকরণ এবং মৌজা ম্যাপসহ বিভিন্ন ভূমি সেবা অনলাইনে দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
সতর্ক থাকুন: জমির মালিকানা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে শুধু অনলাইন রেকর্ড দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন না। দলিল, খতিয়ান, নামজারি এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অফিসের রেকর্ড মিলিয়ে দেখা গুরুত্বপূর্ণ।
দরকারি সরকারি ভূমি সেবা
ভূমি মন্ত্রণালয়:
land.gov.bd
ভূমি উন্নয়ন কর:
ldtax.gov.bd
ভূমি নকশা:
map.land.gov.bd
ভূমি সংক্রান্ত তথ্য:
bhumipedia.land.gov.bd
পুরোনো জমির হিসাব খুঁজতে গেলে সবচেয়ে কাজে দেয় পরিবারের হাতে থাকা কাগজপত্র। একটি পুরোনো দলিল থেকে দাগ বা খতিয়ান নম্বর বের করে সেটি দিয়ে অনলাইনে রেকর্ড খুঁজলে কাজ অনেক সহজ হয়। আর কোনো তথ্য নিয়ে সন্দেহ থাকলে অনলাইনের ফলাফলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের রেকর্ড মিলিয়ে নিলেই বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে।