২০২৬–২৭ করবর্ষের আয়কর রিটার্ন নিয়ে করদাতাদের মধ্যে এবার একটি বিষয় বেশ আলোচনায় এসেছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে ৫ শতাংশ করছাড় পাওয়ার সুযোগ থাকলেও, যাঁরা আগে থেকেই অগ্রিম কর বা বেতন থেকে উৎসে কর দিয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এই ছাড়ের হিসাব কীভাবে হবে—সেখানেই তৈরি হয়েছে কিছু জটিলতা।
বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একজন করদাতার পুরো বছরের করের একটি অংশ যদি আগেই পরিশোধ করা থাকে, তাহলে রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় তাঁর হাতে থাকা প্রকৃত করদায়ের পরিমাণ অনেক কমে যেতে পারে। ফলে ৫ শতাংশ ছাড় কোন অঙ্কের ওপর হিসাব হবে, সেটি সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে করদাতার ওপর।
রিটার্ন জমা দিলে ৫ শতাংশ করছাড় কীভাবে পাওয়া যাবে?
২০২৬–২৭ করবর্ষে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করলে করছাড়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করলে পরিশোধযোগ্য করের ৫ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় পাওয়া যেতে পারে। তবে এই ছাড়ের সর্বোচ্চ সীমা ২৫ হাজার টাকা।
সহজভাবে বললে, রিটার্নের হিসাবে যদি ১ লাখ টাকা কর পরিশোধযোগ্য থাকে, তাহলে ৫ শতাংশ হিসাবে ছাড় হবে ৫ হাজার টাকা। আবার করের পরিমাণ অনেক বেশি হলেও ছাড় ২৫ হাজার টাকার বেশি হবে না।
জটিলতাটা কোথায়?
সমস্যাটি দেখা দিয়েছে আগে কর পরিশোধ করা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে। অনেক চাকরিজীবীর বেতন দেওয়ার সময়ই নির্দিষ্ট পরিমাণ আয়কর কেটে নেওয়া হয়। আবার কিছু করদাতা বছরের মধ্যে অগ্রিম কর পরিশোধ করেন। অর্থাৎ রিটার্ন জমা দেওয়ার আগেই তাঁদের করের একটি অংশ সরকারের কাছে জমা হয়ে যায়।
ধরা যাক, একজন ব্যক্তির হিসাব অনুযায়ী পুরো বছরের করদায় ২ লাখ টাকা। এর মধ্যে বেতন থেকে কেটে নেওয়া বা অগ্রিম কর হিসেবে তিনি ইতিমধ্যে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা দিয়েছেন। ফলে রিটার্ন দাখিলের সময় তাঁর বাকি থাকে ৫০ হাজার টাকা।
এখন প্রশ্ন হলো, ৫ শতাংশ ছাড় পুরো ২ লাখ টাকার ওপর হিসাব হবে, নাকি রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় যে ৫০ হাজার টাকা পরিশোধযোগ্য রয়েছে, শুধু তার ওপর হিসাব হবে। বর্তমান নিয়মের ব্যাখ্যা নিয়ে মূলত এখানেই প্রশ্ন উঠেছে।
অগ্রিম কর দেওয়া ব্যক্তিদের জন্য বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
যাঁরা সারা বছর বেতন থেকে কর দিয়েছেন বা অগ্রিম কর পরিশোধ করেছেন, তাঁদের করের হিসাব অন্য করদাতার তুলনায় কিছুটা আলাদা হতে পারে। কারণ রিটার্ন প্রস্তুতের সময় মোট করদায় থেকে আগে পরিশোধ করা কর সমন্বয় করা হয়।
ফলে করছাড়ের ভিত্তি যদি রিটার্ন দাখিলের সময় বাকি থাকা কর হয়, তাহলে আগে কর পরিশোধ করে রাখা ব্যক্তির ছাড়ের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে। এ কারণেই বিষয়টি নিয়ে করদাতাদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এনবিআর বিষয়টি নিয়ে কী করছে?
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্যের ভিত্তিতে বলা হয়েছে, অগ্রিম কর দেওয়া করদাতাদের ক্ষেত্রে তৈরি হওয়া বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে। প্রয়োজন হলে এ বিষয়ে সংশোধিত বা আরও স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হতে পারে।
তাই রিটার্ন জমা দেওয়ার আগে করছাড়ের হিসাব নিয়ে অনুমান না করে এনবিআরের সর্বশেষ নির্দেশনা দেখে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যাঁরা আগে থেকেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কর দিয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
৩০ সেপ্টেম্বরের আগে রিটার্ন দিলে কী সুবিধা?
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা দেওয়ার অন্যতম সুবিধা হলো ৫ শতাংশ করছাড়ের সুযোগ। এই কারণে যাঁদের রিটার্ন প্রস্তুত করার সব তথ্য হাতে রয়েছে, তাঁরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা না করে আগেই কাজটি শেষ করতে পারেন।
আরো পড়ুনঃ
রিটার্ন প্রস্তুতের সময় আয়, উৎসে কাটা কর, অগ্রিম কর, বিনিয়োগ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য মিলিয়ে নেওয়া ভালো। কোনো তথ্য ভুল থাকলে পরে সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে।
রিটার্ন দেওয়ার আগে যে বিষয়গুলো মিলিয়ে নেবেন
- পুরো করবর্ষের মোট আয় সঠিকভাবে হিসাব করা হয়েছে কি না।
- বেতন বা অন্য কোনো উৎস থেকে কেটে রাখা করের পরিমাণ ঠিক আছে কি না।
- আগে দেওয়া অগ্রিম করের তথ্য রিটার্নে সঠিকভাবে দেখানো হয়েছে কি না।
- প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও অন্যান্য তথ্যের প্রমাণপত্র সংরক্ষিত আছে কি না।
- আগে পরিশোধ করা কর সমন্বয়ের পর প্রকৃত করদায় কত থাকে, তা যাচাই করা হয়েছে কি না।
- ৫ শতাংশ করছাড় প্রযোজ্য হলে সেটি কীভাবে হিসাব করা হচ্ছে, তা সর্বশেষ নিয়মের সঙ্গে মিলছে কি না।
অনলাইনে রিটার্ন দেওয়ার ক্ষেত্রে কী করবেন?
অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল করার সময় ধাপে ধাপে নিজের আয় ও করসংক্রান্ত তথ্য দিতে হয়। তাই শুরু করার আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও কর পরিশোধের তথ্য হাতে রাখলে কাজটি অনেক গোছানোভাবে করা যায়।
বিশেষ করে উৎসে কর বা অগ্রিম করের তথ্য দেওয়ার সময় ভুল হলে মোট করদায়ের হিসাবেও প্রভাব পড়তে পারে। তাই রিটার্ন সাবমিট করার আগে দেওয়া তথ্যগুলো আরেকবার যাচাই করে নেওয়া উচিত।
যাঁরা আগে কর দিয়েছেন, তাঁদের কী করা উচিত?
এ ধরনের করদাতাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের মোট করদায় এবং ইতিমধ্যে পরিশোধ করা করের হিসাব পরিষ্কারভাবে জানা। এরপর রিটার্নে অবশিষ্ট কর কত দাঁড়াচ্ছে এবং প্রযোজ্য ছাড় কীভাবে হিসাব করা হচ্ছে, সেটি যাচাই করতে হবে।
করছাড়ের নিয়ম নিয়ে এনবিআর নতুন কোনো ব্যাখ্যা বা নির্দেশনা দিলে সেটিই অনুসরণ করা উচিত। কারণ অগ্রিম কর দেওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ছাড়ের হিসাব নিয়ে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তার চূড়ান্ত সমাধান সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনার ওপর নির্ভর করবে।
২০২৬–২৭ করবর্ষের রিটার্নে ৫ শতাংশ করছাড়ের সুযোগ থাকলেও সবার ক্ষেত্রে হিসাবটি একইভাবে হবে না। বিশেষ করে যাঁরা আগে থেকেই বেতন থেকে কর দিয়েছেন বা অগ্রিম কর পরিশোধ করেছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে মোট করদায়, পরিশোধ করা কর এবং রিটার্নের সময় বাকি থাকা অর্থ—সবকিছু মিলিয়ে হিসাব করতে হবে।
আরো পড়ুনঃ
দলিল রেজিস্ট্রেশন করতে কি কি কাগজপত্র লাগে সম্পূর্ণ তালিকা ২০২৬
তাই শুধু ছাড় পাওয়ার বিষয়টি দেখলেই হবে না; রিটার্নে দেওয়া প্রতিটি তথ্য সঠিক কি না, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। নিয়মের ব্যাখ্যায় পরিবর্তন এলে সেটি অনুসরণ করে তারপর চূড়ান্তভাবে রিটার্ন দাখিল করাই নিরাপদ।