নবম পে স্কেল ২০২৬: সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুমোদন করেছে সরকার। নতুন কাঠামোয় বিদ্যমান ২০টি গ্রেড রাখা হয়েছে, তবে প্রায় প্রতিটি স্তরেই মূল বেতনের অঙ্ক পরিবর্তন করা হয়েছে। একই সঙ্গে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, মোবাইল, যাতায়াত ও আরও কয়েকটি ভাতার কাঠামোতেও পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তবে নতুন পে স্কেল নিয়ে একটি বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার করা দরকার। মন্ত্রিসভায় বেতন কাঠামো অনুমোদন করা হয়েছে, কিন্তু ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশিত হয়নি। ফলে বাস্তবে কোন সুবিধা ঠিক কোন তারিখে এবং কীভাবে কার্যকর হবে, তার চূড়ান্ত ভিত্তি হবে সরকারি প্রজ্ঞাপন ও সংশ্লিষ্ট এসআরও।
এই প্রতিবেদনে নতুন পে স্কেলের মূল বেতন, গ্রেডভিত্তিক ইনক্রিমেন্ট, বাড়িভাড়া ও অন্যান্য ভাতা, উচ্চতর গ্রেড, iBAS++-এ বেতন নির্ধারণ এবং বাস্তবায়নের বর্তমান অবস্থাকে এক জায়গায় সাজানো হয়েছে।
নবম পে স্কেল ২০২৬ কী
জাতীয় পে স্কেল হলো সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক সুবিধা নির্ধারণের কাঠামো। সর্বশেষ জাতীয় বেতন কাঠামো ২০১৫ সালে কার্যকর হয়েছিল। দীর্ঘ সময় পর ২০২৬ সালের নতুন কাঠামো অনুমোদন পাওয়ায় সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ও বিভিন্ন সুবিধার হিসাব নতুনভাবে সাজানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
নতুন কাঠামোয় ২০টি গ্রেডই রাখা হয়েছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে প্রারম্ভিক মূল বেতনে। নিচের গ্রেডগুলোতে বৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি হলেও উপরের কয়েকটি গ্রেডে বৃদ্ধির হার তুলনামূলক কম রাখা হয়েছে। নতুন কাঠামোয় ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং ১ম গ্রেডের মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন পে স্কেলে ২০ গ্রেডের মূল বেতন
নতুন বেতন কাঠামোর সবচেয়ে প্রয়োজনীয় তথ্যগুলোর একটি হলো প্রতিটি গ্রেডে মূল বেতনের পরিসর। প্রারম্ভিক বেতন বলতে সংশ্লিষ্ট গ্রেডে একজন চাকরিজীবীর বেতন কাঠামোর শুরু বোঝায়। এরপর নির্ধারিত ধাপ ও ইনক্রিমেন্ট অনুযায়ী মূল বেতন বাড়তে থাকে।
| গ্রেড | প্রারম্ভিক মূল বেতন | সর্বোচ্চ মূল বেতন |
|---|---|---|
| ১ম | ১,৫৬,০০০ টাকা | ১,৫৬,০০০ টাকা |
| ২য় | ১,৩২,০০০ টাকা | ১,৫৩,০০০ টাকা |
| ৩য় | ১,১৩,০০০ টাকা | ১,৪৮,৮০০ টাকা |
| ৪র্থ | ১,০০,০০০ টাকা | ১,৪২,৪০০ টাকা |
| ৫ম | ৮৬,০০০ টাকা | ১,৩৯,৭০০ টাকা |
| ৬ষ্ঠ | ৭১,০০০ টাকা | ১,৩৪,০০০ টাকা |
| ৭ম | ৫৮,০০০ টাকা | ১,২৬,৮০০ টাকা |
| ৮ম | ৪৬,০০০ টাকা | ১,১০,৪০০ টাকা |
| ৯ম | ৪৪,০০০ টাকা | ১,০৫,৬০০ টাকা |
| ১০ম | ৩২,০০০ টাকা | ৭৭,৩০০ টাকা |
| ১১তম | ২৫,০০০ টাকা | ৬০,৫০০ টাকা |
| ১২তম | ২৪,৩০০ টাকা | ৫৮,৭০০ টাকা |
| ১৩তম | ২৪,০০০ টাকা | ৫৮,০০০ টাকা |
| ১৪তম | ২০,৫০০ টাকা | ৫৬,৮০০ টাকা |
| ১৫তম | ২২,৮০০ টাকা | ৫৫,২০০ টাকা |
| ১৬তম | ২১,৯০০ টাকা | ৫২,৯০০ টাকা |
| ১৭তম | ২১,৪০০ টাকা | ৫১,৯০০ টাকা |
| ১৮তম | ২১,০০০ টাকা | ৫০,৯০০ টাকা |
| ১৯তম | ২০,৫০০ টাকা | ৪৯,৬০০ টাকা |
| ২০তম | ২০,০০০ টাকা | ৪৮,৪০০ টাকা |
এই হিসাবে সবচেয়ে নিচের ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা হয়েছে। অন্যদিকে ১ম গ্রেডে ৭৮ হাজার টাকা থেকে নতুন মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ৮ম ও ৯ম গ্রেডের ক্ষেত্রেও জাতীয় বেতন কমিশনের প্রস্তাবের তুলনায় চূড়ান্ত অনুমোদিত কাঠামোয় পরিবর্তন আনা হয়েছে।
নবম পে স্কেলে ইনক্রিমেন্ট কত
নতুন কাঠামোয় সব গ্রেডের বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট একই রাখা হয়নি। নিচের ও মধ্যম পর্যায়ের গ্রেডে ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। উপরের গ্রেডে হার ধাপে ধাপে কমেছে।
| গ্রেড | বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট |
|---|---|
| ৬ষ্ঠ থেকে ২০তম | ৫ শতাংশ |
| ৫ম | ৪ শতাংশ |
| ৩য় ও ৪র্থ | ৩.৫০ শতাংশ |
| ২য় | ২.৭৫ শতাংশ |
অর্থাৎ একই হারে সবার বেতন প্রতিবছর বাড়বে না। একজন চাকরিজীবীর গ্রেড যত ওপরে যাবে, নির্ধারিত বার্ষিক বৃদ্ধির হার তত কম হবে। ৬ষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডের জন্য ৫ শতাংশ হার রাখা হয়েছে। ৫ম গ্রেডে ৪ শতাংশ, ৩য় ও ৪র্থ গ্রেডে ৩ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং ২য় গ্রেডে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
Read More:-
College Admission Result 2026: কলেজ ভর্তি রেজাল্ট কবে, কীভাবে দেখবেন ও এরপর কী করবেন
সশস্ত্র বাহিনীতেও একই ধরনের গ্রেডভিত্তিক নীতি অনুসরণের কথা প্রতিবেদনে এসেছে। তবে সামরিক বাহিনীর নিজস্ব পদ ও সুবিধার ক্ষেত্রে আলাদা বাস্তবায়ন নির্দেশনা থাকবে।
নতুন পে স্কেলে বাড়িভাড়া ভাতা
বাড়িভাড়া ভাতার ক্ষেত্রে নতুন কাঠামোয় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হচ্ছে শতাংশের হার কমানো। তবে শুধু শতাংশ কমেছে বলে বাড়িভাড়ার টাকার অঙ্কও কমবে—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। কারণ নতুন কাঠামোয় মূল বেতন আগের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে নতুন মূল বেতনের ওপর কম শতাংশ হিসাব করেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে আগের চেয়ে বেশি টাকা পাওয়া সম্ভব।
| কর্মস্থল | বর্তমান হার | নতুন কাঠামোর হার |
|---|---|---|
| ঢাকা সিটি করপোরেশন | ৫০–৬৫ শতাংশ | ৪০–৬০ শতাংশ |
| অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও সাভার | ৪০–৫৫ শতাংশ | ৩০–৫০ শতাংশ |
| সিটি করপোরেশন ও সাভারের বাইরে | ৩৫–৫০ শতাংশ | ২৫–৪৫ শতাংশ |
তাই একজন সরকারি কর্মচারীর মোট মাসিক আয় হিসাব করার সময় শুধু বাড়িভাড়ার শতাংশ নয়, নতুন মূল বেতন এবং নিজের কর্মস্থল—দুটিই বিবেচনায় নিতে হবে।
চিকিৎসা ভাতা কত হবে
চিকিৎসা ভাতায় বয়সভিত্তিক পরিবর্তন আনার কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য মাসিক চিকিৎসা ভাতার প্রচলিত অঙ্ক ১ হাজার ৫০০ টাকা। নতুন কাঠামোয় বয়সের ওপর ভিত্তি করে সেটি বাড়ানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
| শ্রেণি | প্রস্তাবিত মাসিক চিকিৎসা ভাতা |
|---|---|
| ৫০ বছর পর্যন্ত চাকরিজীবী | ৩,০০০ টাকা |
| ৫০ বছরের বেশি থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত | ৪,০০০ টাকা |
| ৬০–৭০ বছর বয়সি পেনশনার | ৫,০০০ টাকা |
| ৭০ বছরের বেশি বয়সি পেনশনার | ৬,০০০ টাকা |
অর্থাৎ নতুন ব্যবস্থায় শুধু কর্মরত চাকরিজীবী নয়, বয়সভেদে পেনশনারদের চিকিৎসা ভাতার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসছে। তবে কার্যকর হওয়ার চূড়ান্ত নিয়ম সরকারি গেজেট ও সংশ্লিষ্ট নির্দেশনায় নির্ধারিত হবে।
মোবাইল ভাতা কারা পাবেন
নতুন কাঠামোর আরেকটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলো সব গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীকে মোবাইল ভাতার আওতায় আনার প্রস্তাব। বর্তমানে নির্দিষ্ট কয়েকটি উচ্চ গ্রেডের কর্মকর্তারা মোবাইল বিলের সুবিধা পান। নতুন ব্যবস্থায় ৬ষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডের চাকরিজীবীরাও এই সুবিধার আওতায় আসবেন।
| গ্রেড | প্রস্তাবিত মাসিক মোবাইল ভাতা |
|---|---|
| ১ম থেকে ৫ম | ৫০০ টাকা |
| ৬ষ্ঠ থেকে ২০তম | ১৫০ টাকা |
এখানে একটি বিষয় খেয়াল করার মতো। নতুন কাঠামোয় ১ম থেকে ৫ম গ্রেডের জন্য নির্ধারিত মোবাইল ভাতার অঙ্ক বর্তমান কিছু হারের তুলনায় কম হলেও আগে যেসব নিম্ন গ্রেড এ সুবিধা পেত না, তাদের জন্য নতুন করে সুবিধাটি যুক্ত হচ্ছে।
যাতায়াত, টিফিন ও ধোলাই ভাতা
দৈনন্দিন চাকরিজীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত কয়েকটি ছোট ভাতার অঙ্কও বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
| ভাতার ধরন | বর্তমান | নতুন কাঠামো |
|---|---|---|
| যাতায়াত ভাতা | ৩০০ টাকা | ৬০০ টাকা |
| টিফিন ভাতা | ২০০ টাকা | ৫০০ টাকা |
| ধোলাই ভাতা | ১০০ টাকা | ৩০০ টাকা |
জীবনযাত্রার খরচ এবং যাতায়াত ব্যয়ের পরিবর্তন বিবেচনায় এসব ভাতা পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাংলা নববর্ষ, পাহাড়ি ও হাওর-দ্বীপ-চর ভাতা
বাংলা নববর্ষ ভাতার হার নতুন কাঠামোয় মূল বেতনের ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে। অন্যদিকে দুর্গম পার্বত্য এলাকায় কর্মরতদের পাহাড়ি ভাতা মূল বেতনের ২০ শতাংশ রাখার কথা বলা হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট এলাকার জন্য সর্বোচ্চ সীমাও নির্ধারণ করা হচ্ছে।
হাওর, দ্বীপ ও চর এলাকায় কর্মরতদের ক্ষেত্রেও মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে ভাতা বহাল রাখার কথা রয়েছে। এ ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা সীমার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাহাড়ি এলাকার ভাতার ক্ষেত্রে পার্বত্য জেলা ও উপজেলা সদরের জন্য সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা এবং সদরের বাইরের এলাকার জন্য ৫ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।
আর কোন কোন ভাতা অপরিবর্তিত থাকছে
সব ভাতাই নতুন করে পরিবর্তন করা হচ্ছে না। প্রতিবেদনে শিক্ষা সহায়ক ভাতা, কার্যভার ভাতা, আপ্যায়ন ভাতা, কুক অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যালাউন্স, উৎসব ভাতা এবং শ্রান্তি-বিনোদন ছুটি ও ভাতার বিদ্যমান হার ও পরিমাণ বহাল রাখার কথা বলা হয়েছে।
Read Also:-
ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ অনলাইনে: খাজনা দেওয়ার নিয়ম, খরচ ও রসিদ ডাউনলোড
অন্যদিকে ঝুঁকি ভাতাসহ বিভিন্ন বিশেষ ভাতার পরিমাণ বিদ্যমান হারের তুলনায় ২০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে প্রেষণ ভাতার কাঠামোতেও পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে।
উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার নিয়মে পরিবর্তন
পদোন্নতি না হলেও নির্দিষ্ট সময় একই গ্রেডে চাকরি করার পর উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ সরকারি চাকরিতে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। নতুন কাঠামোয় এই সময়সীমায় পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে।
বর্তমানে যেখানে একই গ্রেডে ১০ বছর চাকরির পর উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ ছিল, নতুন কাঠামোয় প্রথমবারের ক্ষেত্রে সময় কমিয়ে ৮ বছর করার কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয়বার উচ্চতর গ্রেডের জন্য একই গ্রেডে পরবর্তী ৬ বছর চাকরির শর্ত রাখা হচ্ছে।
পদোন্নতিযোগ্য পদে কর্মরত এবং পদোন্নতি না পাওয়া কর্মচারীরা চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ দুইবার এই সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পাবেন। আর যেসব পদে পদোন্নতির সুযোগ নেই বা ব্লকড পদ হিসেবে বিবেচিত, সেসব ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ তিনবার উচ্চতর গ্রেডের ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে।
নতুন পে স্কেলে বেতন কীভাবে নির্ধারণ হবে
নতুন পে স্কেলের আরেকটি বড় দিক হচ্ছে বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা। সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা প্ল্যাটফর্ম iBAS++-এ চাকরিজীবীদের তথ্য হালনাগাদ করার পর সফটওয়্যারের মাধ্যমে নতুন বেতন নির্ধারণ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর ফলে প্রতিটি কর্মচারীর চাকরিসংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে কোন গ্রেডে তিনি আছেন, তার বর্তমান অবস্থান কী এবং নতুন কাঠামোয় প্রাপ্য মূল বেতন কত—এসব হিসাব আরও নিয়মতান্ত্রিকভাবে করা সম্ভব হবে।
iBAS++-এ কোন তথ্য দিতে হবে
নতুন বেতন নির্ধারণের জন্য চাকরিজীবীর মৌলিক চাকরিসংক্রান্ত তথ্য সঠিকভাবে হালনাগাদ থাকা প্রয়োজন। প্রতিবেদনে বিশেষভাবে যেসব তথ্যের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো হলো:
- বর্তমান পদ
- বর্তমান গ্রেড
- চাকরিতে যোগদানের তারিখ
- বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের তথ্য
- পদোন্নতির তথ্য
- উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার তথ্য
এসব তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের পর সফটওয়্যার নতুন কাঠামো অনুযায়ী মূল বেতন ও প্রযোজ্য সুবিধা নির্ধারণে ব্যবহার করবে। ফলে কাগজপত্রের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং বেতন পুনর্নির্ধারণের কাজ তুলনামূলকভাবে সহজভাবে করার সুযোগ তৈরি হবে।
iBAS++ ব্যবস্থায় কী সুবিধা হতে পারে
নতুন পদ্ধতিতে শুধু বেতন নির্ধারণ নয়, সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনার অন্যান্য কাজও iBAS++-এর সঙ্গে যুক্ত থাকবে। বেতন বিল, জিপিএফ, সরকারি ঋণ, আয়কর হিসাব এবং ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের মাধ্যমে বেতন ও পেনশন দেওয়ার বর্তমান ব্যবস্থা এই প্ল্যাটফর্মের আওতায় বহাল রাখার কথা বলা হয়েছে।
তথ্যভিত্তিক বেতন নির্ধারণের ফলে হিসাবের ভুল, একই সুবিধা একাধিকবার পাওয়ার সুযোগ এবং অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্য রয়েছে। তবে এই ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগ নির্ভর করবে সরকারি নির্দেশনা এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রস্তুতির ওপর।
নতুন পে স্কেলের জন্য সাতটি SRO কেন
সব সরকারি প্রতিষ্ঠান একই নিয়মে পরিচালিত হয় না। বেসামরিক প্রশাসন, পুলিশ, বিজিবি, সরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, সশস্ত্র বাহিনী এবং বিচার বিভাগের কাঠামো আলাদা হওয়ায় নতুন বেতন কাঠামোর বিস্তারিত বাস্তবায়ন নির্দেশনাও আলাদাভাবে দেওয়ার প্রয়োজন হচ্ছে।
Read More:-
নতুন আইনে নামজারি: কী নিয়ম, কেন জরুরি ও কী কী লাগবে বিস্তারিত নির্দেশিকা
এই কারণে সাতটি পৃথক SRO জারির কথা বলা হয়েছে। এগুলোর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা বাহিনীর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা কীভাবে কার্যকর হবে, তার বিস্তারিত নিয়ম নির্ধারণ করা হবে।
নবম পে স্কেল কবে থেকে কার্যকর
নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হিসেবে গণ্য করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে বর্ধিত মূল বেতন একবারে পুরোপুরি কার্যকর না করে ধাপে ধাপে সমন্বয়ের সিদ্ধান্তের কথা প্রতিবেদনে এসেছে। বাড়িভাড়া ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ভাতার ক্ষেত্রে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর করার সিদ্ধান্তের কথাও প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানে “কার্যকর তারিখ” এবং “হাতে পাওয়া বেতন-ভাতার পূর্ণ বাস্তবায়ন”—দুটিকে একই বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। কোন অংশ কখন কীভাবে পরিশোধ হবে, সেটি চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন ও SRO-তে পরিষ্কার হবে।
চূড়ান্ত গেজেটের সর্বশেষ অবস্থা
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত পাওয়া প্রতিবেদনে নতুন পে স্কেলের চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। ১২ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে প্রজ্ঞাপনের খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ের জন্য পাঠানোর কথা বলা হয়েছিল। পরে ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হয়, গেজেট প্রকাশে আরও প্রশাসনিক ও আইনগত প্রক্রিয়া বাকি রয়েছে।
তাই এখনই কোনো নির্দিষ্ট বেতন-ভাতা হাতে পাওয়ার তারিখকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। গেজেট প্রকাশের পর প্রয়োজনীয় SRO এবং দপ্তরভিত্তিক নির্দেশনা এলে বাস্তবায়নের পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে।
নতুন পে স্কেলে একজন চাকরিজীবীর বেতন কীভাবে বদলাবে
একজন সরকারি চাকরিজীবীর মোট মাসিক আয় শুধু মূল বেতন দিয়ে নির্ধারিত হয় না। মূল বেতনের সঙ্গে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, মোবাইল, যাতায়াতসহ প্রযোজ্য অন্যান্য সুবিধা যোগ হয়। আবার কর্মস্থল, গ্রেড, বয়স এবং চাকরির ধরন অনুযায়ী সব সুবিধা সবার ক্ষেত্রে এক নয়।
তাই নতুন পে স্কেলে নিজের আয় কত বাড়বে জানতে হলে প্রথমে নিজের গ্রেড ও বর্তমান মূল বেতন দেখতে হবে। এরপর নতুন কাঠামোর সেই গ্রেডের প্রারম্ভিক বা প্রযোজ্য বেতন, ইনক্রিমেন্ট, কর্মস্থলভিত্তিক বাড়িভাড়া এবং অন্যান্য প্রযোজ্য ভাতা আলাদা করে হিসাব করতে হবে। শুধু মূল বেতন কত শতাংশ বেড়েছে সেটি দেখে মোট বেতন সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
নতুন পে স্কেল নিয়ে যে বিষয়গুলো মনে রাখা দরকার
- নতুন কাঠামোয় ২০টি গ্রেড রাখা হয়েছে।
- ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং ১ম গ্রেডের মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
- ৬ষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ৫ শতাংশ।
- উচ্চতর গ্রেডে ইনক্রিমেন্টের হার ধাপে ধাপে কমে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত হয়েছে।
- বাড়িভাড়া ভাতার শতাংশ কমলেও নতুন মূল বেতন বাড়ার কারণে টাকার অঙ্ক আলাদাভাবে হিসাব করতে হবে।
- চিকিৎসা ভাতায় বয়সভিত্তিক পরিবর্তন আনা হয়েছে।
- প্রথমবার সব গ্রেডের চাকরিজীবীকে মোবাইল ভাতার আওতায় আনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
- যাতায়াত, টিফিন ও ধোলাই ভাতার অঙ্ক বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।
- বাংলা নববর্ষ ভাতার হার ২০ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে।
- iBAS++-এ চাকরিজীবীর পদ, গ্রেড, যোগদানের তারিখ, ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি ও উচ্চতর গ্রেডের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।
- বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বাহিনীর জন্য পৃথক SRO-এর মাধ্যমে বাস্তবায়নের বিস্তারিত নিয়ম নির্ধারণ করা হবে।
- চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত বাস্তবায়নের বিস্তারিত বিষয়ে সরকারি নির্দেশনাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
শেষ কথা
নবম পে স্কেল ২০২৬ সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য শুধু মূল বেতন পরিবর্তনের বিষয় নয়। এর সঙ্গে ইনক্রিমেন্টের হার, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, মোবাইল, যাতায়াতসহ একাধিক আর্থিক সুবিধার কাঠামো বদলাচ্ছে। পাশাপাশি iBAS++-এর মাধ্যমে বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়াকে আরও তথ্যনির্ভর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে নতুন পে স্কেল নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর অনুমোদিত কাঠামো এবং চূড়ান্ত বাস্তবায়ন নির্দেশনাকে আলাদা করে দেখা। মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পরও গেজেট ও সংশ্লিষ্ট SRO-এর মাধ্যমে বাস্তবায়নের বিস্তারিত নিয়ম নির্ধারিত হবে। তাই নিজের বেতন বা ভাতার চূড়ান্ত হিসাব করার আগে সরকারি প্রজ্ঞাপন এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সর্বশেষ নির্দেশনা দেখা সবচেয়ে নিরাপদ।
দাবিত্যাগ: এই প্রতিবেদনের তথ্য ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন ও অনুমোদিত বেতন কাঠামোর তথ্যের ভিত্তিতে সাজানো হয়েছে। নতুন পে স্কেলের চূড়ান্ত বাস্তবায়ন, বেতন নির্ধারণ, ভাতা এবং কার্যকর তারিখের ক্ষেত্রে সরকারি প্রজ্ঞাপন, SRO ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সর্বশেষ নির্দেশনাই চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে। গেজেট প্রকাশের পর প্রয়োজন হলে এই প্রতিবেদন আপডেট করা হবে।
সর্বশেষ আপডেট: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬