প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ প্রবাসী বাংলাদেশি (Non-Resident Bangladeshi – NRB) কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছেন। কিন্তু বাংলাদেশে ব্যাংক একাউন্ট পরিচালনা, জমি বা ফ্ল্যাট কেনাবেচা, সঞ্চয়পত্র ক্রয় কিংবা ডিপিএস বা এফডিআর (DPS/FDR) খোলার সময় অনেক প্রবাসীই একটি বড় প্রশ্নের মুখে পড়েন—“প্রবাসীদের কি টিআইএন (TIN) সার্টিফিকেট লাগবে? রেমিট্যান্সের টাকায় কি ট্যাক্স বা আয়কর দিতে হবে?”
প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে কি ট্যাক্স দিতে হয়?
সহজ ও স্পষ্ট উত্তর হলো: না, প্রবাসীদের বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর বাংলাদেশে কোনো আয়কর (Income Tax) দিতে হয় না।
বাংলাদেশ সরকারের বিদ্যমান আয়কর আইন অনুযায়ী, কোনো অনিবাসী বা প্রবাসী বাংলাদেশি বিদেশে পরিশ্রম করে বৈধ উপায়ে (যেমন: ব্যাংকিং চ্যানেল, এক্সচেঞ্জ হাউজ বা অফিশিয়াল রেমিট্যান্স অ্যাপ) বাংলাদেশে যে অর্থ পাঠাবেন, তা সম্পূর্ণ **করমুক্ত (Tax-Free)**। এমনকি সরকার এই রেমিট্যান্স উৎসাহিত করতে ইনসেনটিভ বা প্রণোদনাও প্রদান করে থাকে।
প্রবাসীদের কি টিআইএন (TIN Certificate) এবং ট্যাক্স রিটার্ন দেওয়া বাধ্যতামূলক?
রেমিট্যান্সের টাকা করমুক্ত হলেও, প্রবাসীদের নির্দিষ্ট কিছু আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে টিআইএন (e-TIN) এবং ট্যাক্স রিটার্ন জমার কপি বা PSR (Proof of Submission of Return) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
কখন প্রবাসীদের টিআইএন (TIN) লাগবে?
- বাংলাদেশে জমি, ফ্ল্যাট বা রেজিস্ট্রিযোগ্য যেকোনো স্থাবর সম্পত্তি ক্রয় বা বিক্রয় করতে গেলে।
- বাংলাদেশে ব্যাংকে ৫০,০০০ টাকার বেশি এফডিআর (FDR) বা সঞ্চয়পত্র কিনতে গেলে।
- বাংলাদেশে কোনো ট্রেড লাইসেন্স বা ব্যবসা পরিচালনা করতে চাইলে।
- বাংলাদেশে ক্রেডিট কার্ডের আবেদন বা ব্যাংক লোন নেওয়ার ক্ষেত্রে।
- রাইড শেয়ারিং বা গাড়ি রেজিস্ট্রেশন এবং কোম্পানির ডিরেক্টর পদ গ্রহণে।
কখন প্রবাসীদের ট্যাক্স রিটার্ন জমা দিতে হবে?
যদি কোনো প্রবাসীর বাংলাদেশে নিজস্ব কোনো করযোগ্য আয়ের উৎস থাকে—যেমন: বাংলাদেশে বাসা ভাড়া থেকে আয়, শেয়ার বাজারের ডিভিডেন্ড, বাংলাদেশে রাখা এফডিআর বা ডিপিএসের সুদ/মুনাফা কিংবা কোনো ব্যবসা থেকে লাভ—তবে তাকে বাংলাদেশে আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হবে।
Read Also:
Income Tax Return জমা করার নিয়ম: অনলাইনে ও অফলাইনে সম্পূর্ণ গাইড
তবে প্রবাসীর আয় যদি কেবলই বিদেশের উপার্জন হয়ে থাকে এবং বাংলাদেশে কোনো আয়ের উৎস না থাকে, অথচ বিশেষ প্রয়োজনে টিআইএন খুলেছেন—তাহলে তাকে বাংলাদেশে জিরো ট্যাক্স রিটার্ন (Zero Tax Return) জমা দিতে হবে।
প্রবাসীদের জন্য ২০২৬ সালের ইনকাম ট্যাক্স ও করমুক্ত আয়সীমা
বাংলাদেশে প্রবাসীদের কোনো দেশীয় করযোগ্য আয় থাকলে (যেমন: বাংলাদেশে জমি বা বাসা ভাড়া), তা সাধারণ করমুক্ত আয়সীমার অধীনে হিসাব করা হবে:
| প্রবাসী করদাতার ক্যাটাগরি | বাংলাদেশে বার্ষিক করমুক্ত আয়ের সীমা |
|---|---|
| সাধারণ পুরুষ প্রবাসী | ৳ ৩,৫০,০০০ (তিন লাখ ৫০ হাজার টাকা) |
| নারী প্রবাসী এবং ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে জ্যেষ্ঠ নাগরিক | ৳ ৪,০০,০০০ (চার লাখ টাকা) |
| প্রতিবন্ধী বা বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ | ৳ ৪,৭৫,০০০ (চার লাখ ৭৫ হাজার টাকা) |
পরামর্শ: প্রবাসীদের বিদেশের ইনকাম বাংলাদেশে ট্যাক্স ফ্রি, তাই আপনার রিটার্নে ‘Foreign Income’ বা বিদেশ থেকে পাওয়া রেমিট্যান্স হিসেবে সঠিক ডকুমেন্টসসহ তথ্য দেখালে সেই টাকার ওপর কোনো ট্যাক্স আসবে না।
বিদেশে বসে কীভাবে অনলাইনে e-TIN ও e-Return সম্পন্ন করবেন?
২০২৬ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) ই-ফাইলিং সিস্টেম সম্পূর্ণ ডিজিটাল করায় এখন বিশ্বের যেকোনো দেশ থেকেই বিদেশে বসে অনলাইনে প্রবাসীরা নিজেদের টিন এবং রিটার্ন জমা দিতে পারেন।
ধাপ ১: পাসপোর্ট ও এনআইডি দিয়ে e-TIN তৈরি
এনবিআরের ই-ট্যাক্স পোর্টালে (etaxnbr.gov.bd) গিয়ে ‘Individual (Bangladeshi)’ সিলেক্ট করে আপনার এনআইডি (NID) অথবা পাসপোর্ট নম্বর দিয়ে ৫ মিনিটে অনলাইন টিআইএন সার্টিফিকেট জেনারেট করতে পারবেন।
ধাপ ২: ই-রিটার্ন পোর্টালে রেজিস্টার ও লগইন
আপনার এনআইডি দিয়ে নিবন্ধিত বায়োমেট্রিক সিমের মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে এনবিআর পোর্টালে অ্যাকাউন্ট রেজিস্টার করুন। আপনার কাছে যদি বাংলাদেশি সক্রিয় সিম না থাকে, তবে পরিবারের বিশ্বস্ত কারো সিম যা আপনার এনআইডি দিয়ে তোলা, তা ব্যবহার করে OTP গ্রহণ করতে পারেন।
ধাপ ৩: রেমিট্যান্স ও দেশীয় আয়ের তথ্য ইনপুট
রিটার্ন ফর্মে ‘Exempted Income’ বা করমুক্ত আয়ের সেকশনে আপনার ব্যাংকিং চ্যানেলে আসা প্রবাসের রেমিট্যান্সের সঠিক হিসাব দিন। বাংলাদেশে যদি কোনো ব্যাংক ডিপোজিট বা ফ্ল্যাট থাকে, তার তথ্য যথাস্থানে পূরণ করুন।
ধাপ ৪: ফাইনাল সাবমিশন ও PSR প্রাপ্তি
ফর্মটি সাবমিট করার সাথে সাথেই আপনি Tax Return Acknowledgement Receipt (PSR) বা ট্যাক্স জমার প্রাপ্তি স্বীকারপত্র পেয়ে যাবেন। এটি দিয়ে বাংলাদেশে সকল ব্যাংকিং ও আইনি কাজ সম্পন্ন করা যাবে।
প্রবাসীদের ব্যাংক ডিপিএস/এফডিআর-এ ট্যাক্স সাশ্রয়ের নিয়ম (TDS Rate)
বাংলাদেশে কোনো প্রবাসীর ব্যাংকে মেয়াদি আমানত (FDR) বা সঞ্চয় থাকলে লভ্যাংশের ওপর উৎস কর (TDS) কাটা হয়। আপনার যদি টিআইএন এবং রিটার্ন জমার কপি (PSR) ব্যাংকে জমা দেওয়া থাকে, তবে ব্যাংক মাত্র **১০%** ট্যাক্স কাটবে। কিন্তু আপনি যদি রিটার্ন জমা না দেন, তবে প্রবাসীদের আমানত থেকেও ব্যাংক **১৫%** হারে ট্যাক্স কেটে নেবে। তাই বাড়তি ৫% ট্যাক্স বাঁচাতে টিআইএন ও জিরো রিটার্ন ফাইল করা প্রবাসীদের জন্য বেশ লাভজনক।
Read More:
কিভাবে e tin certificate আবেদন করবেন এবং হাতে পাবেন? বিস্তারিত নিয়ম জানুন (২০২৬ আপডেট)
সাধারণ জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
প্রশ্ন ১: আমি প্রবাস থেকে বাংলাদেশে জমি কিনতে চাই, টিআইএন কি বাধ্যতামূলক?
উত্তর: হ্যাঁ, বাংলাদেশের আয়কর আইন অনুযায়ী যে কোনো জমি, ফ্ল্যাট বা রেজিস্ট্রিযোগ্য সম্পত্তি কেনাবেচার ক্ষেত্রে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের টিআইএন ও রিটার্ন সাবমিশন স্লিপ থাকা আবশ্যক।
প্রশ্ন ২: প্রবাসীদের এনআরবি (NRB) ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা টাকার ওপর কি কর দিতে হয়?
উত্তর: না, বৈধ রেমিট্যান্সের মূল টাকার ওপর কোনো কর নেই। তবে ওই টাকায় অর্জিত সুদের (Interest/Profit) ওপর উৎসে কর কাটা হয়।
প্রশ্ন ৩: আমি বিদেশে থাকি, বাংলাদেশে আমার কোনো ইনকাম নেই। আমার কি ট্যাক্স ফাইল করতে হবে?
উত্তর: আপনার যদি টিআইএন সার্টিফিকেট থেকে থাকে এবং জমি বা ব্যাংকের কাজের জন্য PSR জমা দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে, তবে আপনাকে অনলাইনে জিরো ট্যাক্স রিটার্ন জমা দিয়ে পিএসআর স্লিপ সংগ্রহ করতে হবে।
উপসংহার
প্রবাসীদের আয় দেশের অর্থনীতির প্রাণ। সরকার প্রবাসীদের হয়রানি মুক্ত রাখতে অনলাইন আয়কর ব্যবস্থাকে অত্যন্ত সহজ করেছে। সঠিক সময়ে আপনার টিআইএন সংক্রান্ত তথ্য আপডেট রাখা এবং জিরো রিটার্ন ফাইল করে রাখা আপনাকে বাংলাদেশের যেকোনো বড় ধরনের আইনি ও আর্থিক লেনদেনে বাড়তি সুবিধা দেবে।
তথ্যবহুল এই টিউটোরিয়ালটি আপনার অন্যান্য প্রবাসী বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন যেন তারাও সচেতন হতে পারেন!
