স্মার্টফোন হারিয়ে যাওয়ার আগেই তথ্যের নিরাপত্তায় যে ৯টি কাজ অবশ্যই করবেন

Telegram Group Join our Telegram channel
Join
Spread the love

স্মার্টফোন হারিয়ে গেলে প্রথম চিন্তাটা সাধারণত ফোনের দাম নিয়ে হয়। কিন্তু কয়েক মিনিট পর যখন মনে পড়ে ফোনের ভেতরে ব্যক্তিগত ছবি, পরিচিত মানুষের নম্বর, ই-মেইল, ফেসবুক, ব্যাংকিং অ্যাপ, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস এবং নানা গুরুত্বপূর্ণ নথির তথ্য রয়েছে, তখন আসল দুশ্চিন্তা শুরু হয়।

বাস্তবে একটি ফোন হারানো মানে শুধু একটি যন্ত্র হারানো নয়। ফোনটি যদি ঠিকভাবে সুরক্ষিত না থাকে, তাহলে এর সঙ্গে আপনার ব্যক্তিগত তথ্যও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বিশেষ করে ফোনে যদি স্ক্রিন লক দুর্বল হয়, গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে একই পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা হয় কিংবা ছবির সঙ্গে সংরক্ষিত নথির কপি থাকে, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

এই কারণেই ফোন হারানোর পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে হারানোর আগেই কয়েকটি প্রস্তুতি নেওয়া বেশি বুদ্ধিমানের কাজ। নিচের ৯টি কাজ একবার করে রাখলে ফোন হারিয়ে গেলেও ক্ষতির পরিমাণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

১. শক্তিশালী স্ক্রিন লক ব্যবহার করুন

ফোনের নিরাপত্তার প্রথম দরজাই হলো স্ক্রিন লক। অনেকেই চার বা ছয় সংখ্যার সহজ PIN, জন্মতারিখ কিংবা এমন কোনো সংখ্যা ব্যবহার করেন যা আশপাশের মানুষ সহজেই অনুমান করতে পারে। এই অভ্যাস বদলানো দরকার।

সম্ভব হলে এমন PIN ব্যবহার করুন যা অন্য কেউ সহজে আন্দাজ করতে পারবে না। ফোনে সুবিধা থাকলে ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা নির্ভরযোগ্য বায়োমেট্রিক লকের সঙ্গে একটি শক্তিশালী PIN রাখুন। শুধু মুখ শনাক্তকরণ ব্যবহার করে থেমে না থেকে বিকল্প নিরাপত্তা ব্যবস্থাটিও শক্ত রাখুন।

আরেকটি বিষয় অনেকেই খেয়াল করেন না—লক স্ক্রিনে যেন ব্যক্তিগত বার্তা বা OTP-এর সম্পূর্ণ বিষয়বস্তু দেখা না যায়। ফোন হাতে না থাকলেও নোটিফিকেশনের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অন্যের চোখে পড়তে পারে। তাই লক স্ক্রিনে সংবেদনশীল নোটিফিকেশন দেখানোর সেটিংসটি একবার পরীক্ষা করে নিন।

২. ফোন হারালে খুঁজে পাওয়ার সুবিধাটি আগে থেকেই চালু রাখুন

ফোন হারানোর পর সেটি খুঁজে বের করার ফিচার চালু করতে গেলে অনেক সময় দেরি হয়ে যায়। তাই Android ফোনে Google-এর ডিভাইস খোঁজার সুবিধা এবং iPhone-এ Apple-এর Find My সুবিধা আগে থেকেই সক্রিয় আছে কি না দেখে নিন।

এতে ফোন কোথায় রয়েছে তা শনাক্ত করার সুযোগ পাওয়া যেতে পারে। পরিস্থিতি অনুযায়ী ফোনে শব্দ বাজানো, সেটিকে লক করা কিংবা প্রয়োজন হলে দূর থেকে ডেটা মুছে ফেলার মতো ব্যবস্থা নেওয়াও সম্ভব হতে পারে।

এখানে একটি বাস্তব বিষয় মনে রাখা জরুরি: ফোন খুঁজে পাওয়ার আশায় নিজে গিয়ে অপরিচিত কারও সঙ্গে ঝামেলায় জড়ানো ঠিক নয়। অবস্থান দেখে সন্দেহজনক জায়গা মনে হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়াই নিরাপদ।

৩. Google বা Apple অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড ও পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা ঠিক রাখুন

ফোন হারানোর পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টগুলোর একটি হলো ফোনের সঙ্গে যুক্ত মূল অ্যাকাউন্ট। Android ব্যবহারকারীর ক্ষেত্রে Google Account এবং iPhone ব্যবহারকারীর ক্ষেত্রে Apple Account-এর নিরাপত্তা ঠিক না থাকলে অন্য অনেক সুরক্ষা ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

Read Also: পল্লীবিদ্যুৎ প্রিপেইড মিটার লক হলে ঠিক করবেন যে ভাবে

অ্যাকাউন্টে একটি শক্তিশালী ও আলাদা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন। পুনরুদ্ধারের জন্য যে ই-মেইল বা ফোন নম্বর দেওয়া আছে সেটিও আপনার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে কি না যাচাই করুন। পুরোনো নম্বর বা আর ব্যবহার করেন না এমন ই-মেইল থাকলে সেটি আপডেট করে রাখুন।

এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ ফোন হারানোর পর আপনার পরিচয় যাচাই করতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই পুনরুদ্ধারের মাধ্যমের প্রয়োজন হতে পারে।

৪. দুই ধাপের নিরাপত্তা চালু করুন

শুধু পাসওয়ার্ডের ওপর নির্ভর করা এখন আর ভালো অভ্যাস নয়। গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে দুই ধাপের যাচাই বা Two-Factor Authentication চালু করে রাখুন।

বিশেষ করে ই-মেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ক্লাউড স্টোরেজ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অনলাইন অ্যাকাউন্টে এই সুবিধাটি ব্যবহার করা ভালো। তবে একটি বিষয় আগে থেকেই পরীক্ষা করে নিন—ফোন হারালে দ্বিতীয় ধাপের যাচাই কীভাবে সম্পন্ন করবেন?

উদাহরণ হিসেবে, শুধু হারিয়ে যাওয়া ফোনের নম্বরে OTP পাঠানোর ওপর নির্ভর করলে বিপদে পড়তে পারেন। তাই অ্যাকাউন্টের দেওয়া backup code, authenticator বা অন্য নিরাপদ বিকল্প পদ্ধতি থাকলে সেগুলো সম্পর্কে আগে থেকেই জেনে রাখুন।

৫. গুরুত্বপূর্ণ ছবি ও নথির আলাদা ব্যাকআপ রাখুন

ফোনে থাকা ছবি, ভিডিও বা PDF ফাইল হারানোর কষ্ট অনেক সময় ফোন হারানোর চেয়েও বেশি হয়। বিশেষ করে জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, সার্টিফিকেট, জমির কাগজ বা কাজের গুরুত্বপূর্ণ নথির ছবি যদি একমাত্র ফোনেই থাকে, তাহলে ফোন হারানোর সঙ্গে সেগুলোর কপিও হারিয়ে যেতে পারে।

তাই গুরুত্বপূর্ণ ফাইলের অন্তত একটি নিরাপদ ব্যাকআপ রাখুন। ক্লাউড স্টোরেজ ব্যবহার করলে অ্যাকাউন্টটি আলাদা করে সুরক্ষিত করুন। খুব সংবেদনশীল নথি যেখানে-সেখানে আপলোড না করে কোন তথ্য কোথায় রাখছেন সেটিও বিবেচনা করুন।

ব্যাকআপের উদ্দেশ্য শুধু ফোন নষ্ট হলে ফাইল ফেরত পাওয়া নয়; ফোন হারানোর পর নতুন ডিভাইসে দ্রুত কাজ শুরু করতে পারাও এর একটি বড় সুবিধা।

৬. ব্যাংকিং ও আর্থিক অ্যাপের নিরাপত্তা আলাদা করে দেখুন

একটি ফোন হারালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টের পাশাপাশি আর্থিক সেবার অ্যাকাউন্ট নিয়েও চিন্তা করতে হয়। তাই ফোনে কোন কোন ব্যাংকিং, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা পেমেন্ট অ্যাপ রয়েছে তার একটি তালিকা নিজের কাছে জানা থাকা দরকার।

প্রতিটি অ্যাপের আলাদা নিরাপত্তা ব্যবস্থা আছে কি না পরীক্ষা করুন। যেখানে অ্যাপ লক, PIN, বায়োমেট্রিক যাচাই বা অতিরিক্ত নিরাপত্তা সুবিধা রয়েছে, সেগুলো ব্যবহার করুন।

একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল এড়িয়ে চলুন—ফোনের নোট অ্যাপে ব্যাংকিং PIN, কার্ডের PIN বা অন্য সংবেদনশীল তথ্য লিখে রাখা। ফোন হারালে এই ধরনের তথ্য একসঙ্গে পাওয়া গেলে ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

৭. SIM কার্ডের ব্যাপারে আগে থেকেই পরিকল্পনা রাখুন

ফোন হারানোর সঙ্গে সঙ্গে SIM কার্ডটিও আপনার হাতছাড়া হতে পারে। অথচ এই নম্বরের সঙ্গে অনেক অ্যাকাউন্টের OTP, কল এবং পরিচয় যাচাইয়ের ব্যবস্থা যুক্ত থাকে।

তাই নিজের মোবাইল নম্বর কোন কোন গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে ব্যবহার করেছেন তা অন্তত মোটামুটি জানা থাকা ভালো। ফোন হারালে অপারেটরের মাধ্যমে SIM বন্ধ বা প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে। এজন্য নিজের পরিচয়পত্র ও নম্বরের মালিকানার তথ্য কোথায় আছে সেটি আগে থেকেই নিশ্চিত করে রাখুন।

বিশেষ করে এমন নম্বর যদি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করেন এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ সেবার সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে সেটিকে অবহেলা করার সুযোগ নেই।

৮. ফোনে সংবেদনশীল তথ্য জমিয়ে রাখার অভ্যাস কমান

অনেক সময় ফোন চুরি হওয়ার চেয়ে ফোনের ভেতরের তথ্য ফাঁস হওয়াটাই বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। যেমন—কারও NID-এর ছবি, ব্যাংক হিসাবের তথ্য, পাসওয়ার্ডের তালিকা, ব্যক্তিগত নথি বা অফিসের গোপন ফাইল গ্যালারি কিংবা ডাউনলোড ফোল্ডারে পড়ে থাকতে পারে।

ফোনটি একবার খুলতে পারলে এসব তথ্য একসঙ্গে পাওয়া সম্ভব হতে পারে। তাই প্রয়োজন শেষ হয়ে গেলে অপ্রয়োজনীয় নথি মুছে ফেলুন। পাসওয়ার্ড সংরক্ষণের জন্য এলোমেলো নোট, মেসেজ বা গ্যালারি ব্যবহার না করে নির্ভরযোগ্য password manager বা সংশ্লিষ্ট সেবার নিরাপদ পদ্ধতি ব্যবহার করা ভালো।

একটি সহজ অভ্যাস তৈরি করতে পারেন—প্রতি মাসে একবার ফোনের Downloads, Documents, Screenshots এবং অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ পরীক্ষা করা। এতে ফোনও গোছানো থাকবে, পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় তথ্য জমে থাকার ঝুঁকিও কমবে।

৯. ফোন হারালে প্রথম ৩০ মিনিটে কী করবেন, সেটা আগে থেকেই জানুন

ফোন হারানোর মুহূর্তে মানুষ সাধারণত উত্তেজিত থাকে। তখন কোন অ্যাকাউন্ট আগে বন্ধ করতে হবে, কোথায় ফোন লক করতে হবে বা SIM কীভাবে বন্ধ করতে হবে—এসব মনে করা কঠিন হতে পারে। তাই আগে থেকেই একটি ছোট জরুরি তালিকা তৈরি করে রাখুন।

Read More: বাংলাদেশে ট্রেড লাইসেন্স করার নিয়ম: কী লাগে, কোথায় করবেন ও নবায়নের পদ্ধতি

তালিকায় অন্তত এগুলো রাখতে পারেন:

  • ফোনের অবস্থান শনাক্ত বা ডিভাইস লক করার ব্যবস্থা
  • SIM বন্ধ বা প্রতিস্থাপনের জন্য মোবাইল অপারেটরের যোগাযোগের তথ্য
  • Google বা Apple Account-এ প্রবেশের পুনরুদ্ধার পদ্ধতি
  • ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবার জরুরি যোগাযোগের তথ্য
  • প্রয়োজনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ই-মেইলের পাসওয়ার্ড পরিবর্তনের পরিকল্পনা
  • চুরি হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করার প্রয়োজনীয় তথ্য

এই তালিকাটি হারিয়ে যাওয়া ফোনেই রাখবেন না। কাগজে লিখে নিরাপদ জায়গায় রাখতে পারেন অথবা এমন কোনো নির্ভরযোগ্য ডিভাইস/অ্যাকাউন্টে সংরক্ষণ করতে পারেন যেটিতে ফোন হারালেও প্রবেশ করা সম্ভব।

ফোন হারানোর পর যে ভুলটি না করাই ভালো

ফোন হারিয়ে গেলে অনেকে আগে নিজের নম্বরে বারবার কল করতে থাকেন। পরিচিত কেউ ফোন পেয়ে থাকলে এটি কাজে আসতে পারে, কিন্তু চুরি হয়ে থাকলে শুধু কল করার ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়। একই সময়ে ফোনটি লক করা, গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্ট সুরক্ষিত করা এবং SIM নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

আরেকটি বিষয় হলো—কেউ যদি ফোন ফেরত দেওয়ার কথা বলে আপনার Google, Apple, Facebook বা অন্য কোনো অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড, OTP বা verification code চায়, সেটি কাউকে দেওয়া উচিত নয়। ফোন ফেরত পাওয়ার আশায় এমন তথ্য দিলে উল্টো অ্যাকাউন্ট হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

একবার ১০ মিনিট সময় নিয়ে এগুলো পরীক্ষা করে নিন

ফোন হাতে থাকা অবস্থায় আজই নিরাপত্তার এই বিষয়গুলো দেখে নিতে পারেন। স্ক্রিন লক শক্ত আছে কি না, ফোন খোঁজার সুবিধা চালু আছে কি না, মূল অ্যাকাউন্টে পুনরুদ্ধারের নম্বর ও ই-মেইল ঠিক আছে কি না, দুই ধাপের যাচাই সক্রিয় কি না এবং গুরুত্বপূর্ণ ফাইলের ব্যাকআপ আছে কি না—এক এক করে পরীক্ষা করুন।

সবচেয়ে ভালো নিরাপত্তা ব্যবস্থা হলো এমন প্রস্তুতি, যার কথা বিপদের সময় নতুন করে ভাবতে হয় না। ফোনটি হারানোর আগে কয়েক মিনিটের এই প্রস্তুতি পরবর্তীতে একটি বড় ধরনের তথ্যগত ক্ষতি সামলানোর ঝামেলা অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে।

Telegram Group Join our Telegram channel
Join
SA Samim

আমি শামীম ইসলাম, Forumbd24.com এর প্রতিষ্ঠাতা। আমি একজন চাকরীজীবী। চাকুরীর পাশাপাশি forumbd24 এ লেখালিখি করি। আমি জয়পুরহাট সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি (বিজ্ঞান) নিয়ে পড়াশুনা করেছি।

Leave a Comment